এরশাদ স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে গণআন্দোলনের অন্যতম শহীদ তাজুল ইসলাম স্মরণে স্থাপিত অস্থায়ী বেদীতে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সংগঠন ও ব্যক্তিবর্গ পুষ্পস্তবক অর্পণের মধ্য দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছে।
এ সময় সিপিবি সভাপতি কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন বলেন, স্বৈরাচারবিরোধী গণআন্দোলনের শহীদদের প্রতি আমাদের অঙ্গীকার অনুসারে আজও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ নির্মাণ সম্ভব হয়নি।
তিনি বলেন, নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের পরবর্তী সময়ে যারা ক্ষমতায় ছিলো এবং চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে ক্ষমতাসীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার শহীদদের আত্মত্যাগ ও তাদের আকাঙ্ক্ষার প্রতি সুবিচার করেনি।
তিনি আরও বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে হারানো ভোটাধিকার ফিরিয়ে আনা সম্ভবপর হলেও নতুন সরকারের কর্মকাণ্ড গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠা অভিমুখী মনে হচ্ছে না।
আজ ১ মার্চ ২০২৬, শনিবার, সকাল ১০টায় সিপিবির কেন্দ্রীয় কার্যালয় মুক্তিভবনের সামনে স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী গণআন্দোলনের শহীদ কমরেড তাজুল ইসলাম স্মরণে অস্থায়ী বেদীতে শ্রদ্ধা নিবেদন অনুষ্ঠিত হয়। শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সিপিবির সভাপতি কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন, সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন, সাবেক সভাপতি ও কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মোহাম্মদ শাহ আলম বক্তব্য রাখেন। শ্রদ্ধা নিবেদন অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন সিপিবি কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য আসলাম খান।
সমাবেশে সিপিবির সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন বলেন, কমরেড তাজুল ইসলাম তার জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন মানব মুক্তির সংগ্রামে। স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী সংগ্রামে তিনি শহীদ হয়ে আজও আমাদের সামনে মানুষের অধিকার আদায়ের এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছেন।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান সংকটকালে আদর্শনিষ্ঠ রাজনীতি ও আত্মত্যাগের অসামন্য উদাহরণ কমরেড তাজুল ইসলাম।
তিনি বলেন, দেশি-বিদেশি শাসকগোষ্ঠী এ দেশে স্বাধীন বামপন্থী ও গণতান্ত্রিক বিকল্প শক্তির উত্থান ঠেকাতে চায়। সাম্রাজ্যবাদ, আঞ্চলিক আধিপত্যবাদ ও দেশীয় শাসকগোষ্ঠীর এই চক্রান্তের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ তীব্র করে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
সিপিবি সাধারণ সম্পাদক আরও বলেন, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ইরানে সাধারণ মানুষের ওপর হামলা করছে, সম্পদ লুণ্ঠনের জন্য দেশে দেশে আগ্রাসন চালাচ্ছে। শুল্ক বৃদ্ধি করে একচেটিয়া বাণিজ্য নীতি অনুসরণ করছে।
তিনি দেশের মানুষের প্রতি যুদ্ধ আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সংগ্রাম ও জনমত গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
সিপিবির সাবেক সভাপতি ও কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মোহাম্মদ শাহ আলম বলেন, ১৯৯০ এর গণঅভ্যুত্থান একদিনে সংঘটিত হয় নাই। দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়েই এই গণঅভ্যুত্থান সফল হয়েছিল। গণতন্ত্রের আকাঙ্ক্ষা থেকে কমরেড তাজুলসহ অসংখ্য মানুষকে জীবন দিতে হয়েছিল। কিন্তু তাদের মহান আত্মত্যাগ সত্ত্বেও পরবর্তী সরকারগুলো দেশের সকল গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানে দলীয় দখলদারিত্ব কায়েমের মধ্য দিয়ে শহীদদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকারও প্রশাসন, স্থানীয় সরকার থেকে শুরু করে সর্বত্র দলীয়করণ করছে। যা দেখে একথাই স্মরণ হয় যে, ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নেয় না।
সকাল ১০টায় অস্থায়ী বেদীতে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির পক্ষ থেকে শ্রদ্ধাঞ্জলির মধ্য দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন পর্ব শুরু হয়। এরপর শ্রদ্ধা নিবেদন করে গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট, বাম গণতান্ত্রিক জোট, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি ঢাকা মহানগর উত্তর কমিটি, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ কমিটি, ঢাকা জেলা, বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র (টিইউসি), বাংলাদেশ কৃষক সমিতি, বাংলাদেশ ক্ষেতমজুর সমিতি, বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র, বাংলাদেশ হকার্স ইউনিয়ন, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, রিকশা-ভ্যান-ইজিবাইক শ্রমিক ইউনিয়ন, গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র, বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, সিপিবি সূত্রাপুর থানা, সিপিবি হাজারীবাগ থানা, সিপিবি তেজগাঁও থানা, সিপিবি পল্টন থানা, সিপিবি গেন্ডারিয়া শাখা, সিপিবি অফিস শাখা, সোমেন-তাজুল পাঠাগারসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সংগঠন ও ব্যক্তিবর্গ।
পরে আন্তর্জাতিক সংগীতের মধ্য দিয়ে কর্মসূচির সমাপ্তি ঘটে।
উল্লেখ্য, ১৯৮৪ সালের ১ মার্চ দেশব্যাপী আহূত শিল্প ধর্মঘট ও হরতালের সমর্থনে আগের দিন মধ্যরাতে আদমজী জুটমিল এলাকায় কমরেড তাজুলের নেতৃত্বে শ্রমিকরা প্রচার মিছিল বের করলে, তৎকালীন স্বৈরশাসক এরশাদ সরকারের গুণ্ডাবাহিনীর হামলায় কমরেড তাজুল ইসলামসহ কয়েকজন শ্রমিক মারাত্মক আহত হন। ১ মার্চ ভোরবেলা গুরুতর আহত অবস্থায় কমরেড তাজুলকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তির কিছুক্ষণ পরে তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।