
স্বৈরাচারবিরোধী গণআন্দোলনের মহান শহীদ কমরেড তাজুল ইসলামের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)’র সভাপতি কমরেড মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, শহীদ কমরেড তাজুল ইসলাম বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। শহীদ তাজুলের দেখানো পথে আজও তাঁর কমরেডরা গণতন্ত্র ও বাকস্বাধীনতার জন্য লড়াই করে যাচ্ছে।
৩৭তম শহীদ তাজুল দিবসে আজ ১ মার্চ ২০২১, সোমবার পুরানা পল্টনে মুক্তিভবনের সামনে নির্মিত অস্থায়ী শহীদ বেদিতে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদেনের পর অনুষ্ঠিত সংক্ষিপ্ত সমাবেশে কমরেড সেলিম এসব কথা বলেন। এ সময় বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, গণসংগঠন, পেশাজীবী ও সাংস্কৃতিক সংগঠনসমূহ শহীদ তাজুলের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে।
কমরেড সেলিম বলেন, শহীদ তাজুল শ্রমিকশ্রেণির মুক্তিকে চূড়ান্ত লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করে তৎকালীন স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র ও মেহনতি মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য সংগ্রামে নিয়োজিত হয়েছিলেন। এ সংগ্রামে তিনি তাঁর জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। আজ কমরেড তাজুলের আত্মত্যাগের ৩৭ বছর পরেও দেশের মানুষের ভোটের অধিকার এবং মতপ্রকাশের অধিকার হরণ করা হচ্ছে। ক্ষমতাসীন সরকারের বিরুদ্ধে দেশের মানুষের সংগ্রামে শহীদ তাজুল সর্বদাই অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবেন।
কমরেড সেলিম কুখ্যাত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে কারাগারে বন্দী লেখক মুশতাক আহমেদের মৃত্যুকে হত্যাকাণ্ড উল্লেখ করে বলেন, এই সকল নিবর্তনমূলক আইন জনগণের নিরাপত্তার জন্য নয়, বরং বিনা ভোটে ক্ষমতায় থেকে অবাধ লুটপাটকে নিরাপদ রাখার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। তিনি অবিলম্বে কারাবন্দী ৭ ছাত্রনেতার নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করেন। একইসঙ্গে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে কারাবন্দী সকলের মুক্তির দাবি জানান।
কমরেড সেলিম আরো বলেন, তাজুলের মত এক ঝাঁক শিক্ষিত তরুণ নিজের ব্যক্তিগত জীবন তুচ্ছ জ্ঞান করে সমষ্টির মুক্তির জন্যে ঝাঁপিয়ে পড়বে এটাই যুগের দাবি। একটা শোষণমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার লড়াইকে এগিয়ে নিতে তিনি তরুণ সমাজকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
সিপিবি’র সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ শাহ আলম বলেন, শহীদ কমরেড তাজুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়েও ব্যক্তিগত আরাম-আয়েশ পরিত্যাগ করে এদেশের শ্রমজীবী মানুষের মুক্তির জন্য নিজেকে নিবেদিত রেখেছিলেন। বদলি শ্রমিকের কাজ নিয়ে আদমজী পাটকলে শ্রমিকদের সংগঠিত করেছিলেন। এরশাদ স্বৈরাচারের গুণ্ডারা তাঁকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করেছে। কমরেড তাজুল নিজের মতাদর্শগত চেতনায় এবং পার্টির নির্দেশে স্বৈরাচারবিরোধী হরতাল সফল করতে গিয়ে জীবন দিয়েছিলেন। তাঁর মৃত্যু এক মহান মৃত্যু। কিন্তু তাঁর জীবন সংগ্রাম

আরো মহান। আজ মালিকদের দ্বারা শ্রমিক শোষণের নির্মমতা অতীতের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। তিনি কমরেড তাজুলের ন্যায় মালিকশ্রেণির শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পার্টি সদস্য-সমর্থকদের প্রতি আহ্বান জানান।
উল্লেখ্য, কমরেড তাজুল ইসলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর শ্রেণিতে পাঠ শেষে ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)’র সিদ্ধান্ত অনুসারে শ্রমিকশ্রেণির মুক্তির সংগ্রামকে অগ্রসর করার মহান ব্রত নিয়ে আদমজী মিলে বদলি শ্রমিকের চাকরি নেন। আদমজীতে ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন ও সংগঠন গড়ে তোলার কাজে তিনি আত্মনিয়োগ করেন। তিনি ছিলেন সিপিবি’র আদমজী শাখার সম্পাদক ও আদমজী মজদুর ট্রেড ইউনিয়নের নেতা।
১৯৮৪ সালের ১ মার্চ দেশব্যাপী আহূত শিল্প ধর্মঘট ও হরতালের সমর্থনে আগের দিন মধ্যরাতে আদমজী জুটমিল এলাকায় কমরেড তাজুলের নেতৃত্বে শ্রমিকরা প্রচার মিছিল বের করলে, তৎকালীন স্বৈরশাসক এরশাদ সরকারের গুণ্ডাবাহিনীর হামলায় কমরেড তাজুল ইসলামসহ কয়েকজন শ্রমিক মারাত্মক আহত হন। ১ মার্চ ভোরবেলা গুরুতর আহত অবস্থায় কমরেড তাজুলকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তির কিছুক্ষণ পরে তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।
শহীদ তাজুল স্মৃতি বেদিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের শ্রদ্ধা নিবেদন
আজ ১ মার্চ ২০২১, সোমবার সকাল ১০টা থেকে ১১টা পর্যন্ত অস্থায়ী শহীদ বেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়। বিভিন্ন দল, সংগঠনের পুষ্পার্ঘ্য নিবেদনের মধ্য দিয়ে শহীদ তাজুলের স্মরণে নির্মিত অস্থায়ী বেদি ফুলে ফুলে ভরে যায়। প্রথমেই সিপিবি’র কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেন।
এরপর একে একে শ্রদ্ধা নিবেদন করে বাম গণতান্ত্রিক জোট, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টি, গণসংহতি আন্দোলন, বাসদ (মার্কসবাদী) কেন্দ্রীয় পাঠচক্র ফোরাম, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, বাংলাদেশের সাম্যবাদী দল (এমএল), গণফোরাম, শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ), বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, বাংলাদেশ ক্ষেতমজুর সমিতি, বাংলাদেশ কৃষক সমিতি, বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন, গণতান্ত্রিক আইনজীবী সমিতি, ইঞ্জিনিয়ার্স এন্ড আর্কিটেক্ট ফর এনভায়র্ণমেন্ট এন্ড ডেভেলপমেন্ট, বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র (টিইউসি), সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্ট, জাতীয় শ্রমিক ফেডারেশন, জাতীয় শ্রমিক জোট-বাংলাদেশ, গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র, গার্মেন্ট শ্রমিক অধিকার আন্দোলন, ট্যানারি ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন, সাপ্তাহিক একতা, বাংলাদেশ হকার্স ইউনিয়ন, সিপিবি’র বিভিন্ন জেলা ও থানা শাখাসমূহ।