Revolutionary democratic transformation towards socialism

বৈশ্বিক মহামারি করোনা মোকাবেলায় সর্বদলীয় জাতীয় কমিটি গঠন করুন

বাম গণতান্ত্রিক জোট কেন্দ্রীয় পরিচালনা পরিষদের এক সভা গতকাল ৯ এপ্রিল ২০২১ সন্ধ্যা ৭টায় ভার্চুয়ালি অনুষ্ঠিত হয়। জোটের সমন্বয়ক ও বাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য বজলুর রশীদ ফিরোজ এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় উপস্থিত থেকে আলোচনা করেন বাসদ এর সাধারণ সম্পাদক কমরেড খালেকুজ্জামান, সিপিবি’র সহকারী সাধারণ সম্পাদক কমরেড সাজ্জাদ জহির চন্দন, প্রেসিডিয়াম সদস্য কমরেড আব্দুল্লাহ আল কাফি রতন, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক কমরেড সাইফুল হক, পলিটব্যুরো সদস্য আকবর খান, বাসদ (মার্কসবাদী) নেতা মানস নন্দী, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনোয়েদ সাকি, সম্পাদক বাচ্চু ভুইয়া, কমিউনিস্ট লীগের সাধারণ সম্পাদক মোশারফ হোসেন নান্নু, সম্পাদক অধ্যাপক আব্দুস সাত্তার, ওয়ার্কার্স পার্টি (মার্কসবাদী) সাধারণ সম্পাদক ইকবার কবীর জাহিদ, সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের সভাপতি হামিদুল হক, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির শহীদুল ইসলাম সবুজ।

সভার এক প্রস্তাবে করোনার সংক্রমণ ও মৃত্যু ভয়াবহ বৃদ্ধিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়, সরকারের অবহেলা, আত্মতুষ্টি, দুর্নীতির ফলেই করোনার ২য় ঢেউয়ে সংক্রমণ ও মৃত্যুর মিছিল ক্রমাগত বেড়ে চলেছে। প্রস্তাবে বলা হয়, ইতিহাস থেকে বর্তমান সরকার কোন শিক্ষাই নেয়নি। ইতিহাস বলে, প্লেগ, স্প্যানিস ফ্লুসহ সকল মহামারীতেই ২য় ঢেউয়ে পূর্বের তুলনায় বেশি মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে। ফলে করোনা মোকাবেলায় প্রথমে বলেছিল সরকার করোনার চেয়ে বেশি শক্তিশালী এবং পরে বলা হলো আমরা করোনা জয় করে ফেলেছি। এই দম্ভ এবং আত্মতৃপ্তির কারণেই করোনা পরিস্থিতি আজ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে, ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে।

প্রস্তাবে বলা হয় গত ১৩ মাসের অধিক সময় পেলেও সরকার স্বাস্থ্যখাতে যে সকল প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলা দরকার ছিল তার কোন কিছুই করেনি। করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতাল ও শয্যা সংখ্যা বাড়ানো, হাই ফ্লো অক্সিজেন ক্যানুলা ও কেন্দ্রীয় অক্সিজেন সাপ্লাই ব্যবস্থা চালু এবং আইসিইউ বেড স্থাপন কোন কিছুই করতে পারেনি। এজন্য সরকারের নীতি পরিকল্পনা যেমন দায়ী, তেমনি দুর্নীতি, লুটপাটের ফলে স্বাস্থ্য খাতের বেহাল দশায় জনভোগান্তি ক্রমেই বেড়েছে। শুরুতে এন-৯৫ মাস্ক, পিপিইসহ চিকিৎসসা সরঞ্জামে ব্যাপক দুর্নীতি হয়েছে এবং অব্যাহত আছে।

প্রস্তাবে বলা হয়, বাম জোটের পক্ষ থেকে গত বছর ফিল্ড হাসপাতালের দাবি করা হলেও সরকার কর্ণপাত করেনি। ৩১ কোটি টাকা ব্যয়ে বসুন্ধরায় ২ হাজার বেডের আইসোলেশন সেন্টার তৈরি করা হচ্ছে। মহাখালীতে ডিএনসিসি মার্কেটের ৭ম তলায় ১২০০ বেডের হাসপাতাল ১৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছে। ঢাকঢোল পিটিয়ে প্রচার করা হলো। কোন রোগির চিকিৎসা ছাড়াই হাসপাতাল ২টি উধাও হয়ে গেছে। এখন শোনা যাচ্ছে নতুন করে ৩টি ফিল্ড হাসপাতাল ও ডিএনসিসি মার্কেটের ৫ম তলায় ১ হাজার বেডের হাসপাতাল করা হচ্ছে। চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য সেবার নামে এ এক হরিলুটের কারবার।

প্রস্তাবে বলা হয়, করোনার ২য় ঢেউয়ে ব্রিটেন ও সাউথ আফ্রিকার ভেরিয়েন্ট আসার কথা বিসিএসআইআর জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসেই সরকারের আইইডিস্আির এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে জানানোর পরও সে সম্পর্কে স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয় সরকার কোন পদক্ষেপ না নিয়ে গোপন করেছে মুজিববর্ষ ও সুবর্ণজয়ন্তী ঘটা করে পালনের জন্য। এতে করে অনেক বেশি তীব্রতা সম্পন্ন করোনা ভেরিয়েন্ট আগ্রাসীভাবে সংক্রমণ করে চলেছে। ফলে হাসপাতালসমূহে রোগি সংকুলান হচ্ছে না, গত বছরের মতোই এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতাল, ৪/৫টি হাসপাতাল ঘুরে রাস্তায় এম্বুলেন্সেই মানুষ কোন প্রকার চিকিৎসা ছাড়াই মৃত্যুবরণ করছে।

প্রস্তাবে বলা হয়, গত বছরেও আমরা বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে অধিগ্রহণ করে করোনা চিকিৎসসায় ব্যবহার করতে বলেছিলাম। কিন্তু সরকার তা না করে তাদের মুনাফা বাণিজ্য করতে দিয়েছে।

সভার প্রস্তাবে বলা হয়, স্বাস্থ্য সেবায় নিয়োজিত চিকিৎসক, নার্সসহ স্বাস্থ্যসেবা কর্মীদের ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রীর অপর্যাপ্ততা এবং তাদের ঝুঁকি ভাতার বিষয়টি অনিশ্চিত থাকায় তাদের মধ্যেও এক ধরনের ভীতি কাজ করছে। ইতিমধ্যেই ১৩৫ জন ডাক্তার মৃত্যুবরণ করেছেন। একই সাথে গত বছর অধিক সময় ধরে করোনা রোগির সেবা দিতে গিয়ে তারাও ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। নতুন করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যসেবা কর্মী নিয়োগ দিয়ে জনবল বাড়ানোরও পরিকল্পিত কোন উদ্যোগ নাই।

সভার প্রস্তাবে বলা হয়, সরকারি হাসপাতালে করোনা চিকিৎসা করাতেই কমপক্ষে দেড়-দুই লাখ টাকা খরচ হয় এবং বেসরকারি হাসপাতালে কমপক্ষে ৫/৬ লাখ টাকা ব্যয় হয়। এই ব্যয়বহুল চিকিৎসা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। ফলে বিনামূল্যে সকল নাগরিকের করোনা পরীক্ষা, চিকিৎসা এবং টিকার ব্যবস্থা সরকারকেই করতে হবে। ভারতের একটি রাজ্যেই (মহারাষ্ট্রে) যেখানে দিনে দুই লাখ করোনা টেস্ট করা হয় সেখানে আমাদের দেশে সর্বোচ্চ ৩০ হাজার টেস্ট করা হয়েছে ১ দিনে। এটা বাড়িয়ে কমপক্ষে দিনে ১ লাখ টেস্ট করা জরুরি। ভ্যাকসিন নিয়েও সরকারের পরিকল্পনা অস্বচ্ছ এবং অদূরদর্শী। শুধু মাত্র অক্সফোর্ডের টিকার উপর নির্ভর করে এখন বিপদের সম্মুখীন। আন্তর্জাতিক টিকা বাণিজ্যের খপ্পরে পড়ে এবং ভারতের কাছে নতজানু নীতির কারণে চীনের টিকার ট্রায়ালের অনুমতি দেয়নি। অন্য কোন দেশ থেকে টিকা আনার কোন উদ্যোগ নেয়নি।

সভার প্রস্তাবে বলা হয়, গত বছরেও বামজোট সরকারের কাছে আহ্বান জানিয়েছিল যে, করোনা বৈশ্বিক মহামারী ফলে এর মোকাবেলা শুধু সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয়। এই মহামারীকে জাতীয় দুর্যোগ ঘোষণা করে সর্বদলীয় কমিটি করে মোকাবেলা করতে হবে। কিন্তু সরকার আত্মম্ভরীতা ও সংকীর্ণতার পরিচয় দিয়ে সবকিছুকে দলীয়করণ করার মানসিকতা থেকেই সে প্রস্তাবে সাড়া দেয়নি। আমরা আবারও একই দাবি পুনরায় জানাতে চাই সময় থাকতে সর্বদলীয় কমিটি করে জাতীয়ভাবে করোনা মোকাবেলায় পদক্ষেপ গ্রহণ করুন।

সভার প্রস্তাবে বলা হয়, মানুষ অতীত থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার কোন শিক্ষাই নেয়নি। গত বছরেও সাধারণ ছুটি ঘোষণা, তার মধ্যেই গার্মেন্টস বন্ধ, খোলা ইত্যাদির মাধ্যমে শ্রমিকদের একবার গ্রামে পাঠানো, আরেকবার ঢাকায় ফিরিয়ে আনা আবার গ্রামে পাঠিয়ে করোনাকে সারাদেশে ছড়িয়ে দিয়েছিল। এবারেও ৫ এপ্রিল প্রথমে বলা হলো এক সপ্তাহের লকডাউন, পরে বলা হলো কিছু ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা, সর্বশেষ প্রধানমন্ত্রীর স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে বলা হলো চলাচল সীমিত করা হত্যাদি। কিন্তু দেখা গেল পরে মহানগরে গাড়ী চলাচল করতে দেয়া, দোকানপাট, শপিং মল খোলার অনুমতি দিয়ে এক লক্কর ঝক্কর লকডাউন এখন চলছে। একদিকে লকডাউন, অপর দিকে গার্মেন্টস কলকারখানা, অফিস আদালত, বইমেলা চালু রেখে অন্য কিছু বন্ধ মানুষ মানবেই বা কেন। তাছাড়া দিন এনে দিন খাওয়া মানুষের খাদ্য, চিকিৎসা ও নগদ অর্থ দেয়ার দায়িত্ব সরকার না নিলে কোন লকডাউনই যে কার্যকর করা যাবে না এটা বারে বারে প্রমাণিত।

ফলে সরকার যে ১৪ এপ্রিল থেকে কঠোর লকডাউনে যাওয়ার কথা বলছে সে ক্ষেত্রে নিন্মোক্ত দাবিসমূহ বাস্তবায়ন করার দাবি বাম জোটের সভা থেকে সরকারের প্রতি জানানো হয়।

১.    লকডাউনে গ্রাম-শহরের শ্রমজীবীদের জন্য এক মাসের খাদ্য ও নগদ ৫ হাজার টাকা দুর্নীতি ও দলীয়করণমুক্তভাবে প্রদান করতে হবে।

২.    সকল জেলা-উপজেলায় করোনা পরীক্ষার আরটিপিসিআর ল্যাব স্থাপন করে প্রতিদিন কমপক্ষে ১ লাখ করোনা টেস্ট বিনামূল্যে করতে হবে।

৩.    সকল জেলা সদরের হাসপাতালে কেন্দ্রীয় অক্সিজেন সাপ্লাই ব্যবস্থা চালু ও কমপক্ষে ২০টি আইসিইউ বেড স্থাপন করতে হব্

৪.    সকল নাগরিকের বিনা মূল্যে করোনা চিকিৎসা ও ভ্যাকসিন দিতে হবে। সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে। এক দেশ এক কোম্পানি না, চীন, রাশিয়াসহ একাধিক দেশ থেকে টিকা আনার উদ্যোগ নিতে হবে। বেসরকারি টিকা বাণিজ্য করতে দেয়া যাবে না।

৫.    করোনা মহামারীকে জাতীয় দুর্যোগ ঘোষণা করে সর্বদলীয় কমিটি গঠন করে পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হবে।

৬.    হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক-নার্স, টেকনিসিয়ানসহ পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগ কর। স্বাস্থ্যসেবা কর্মীদের প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ও ঝুঁকিভাতা দিতে হবে।

কর্মসূচি

উপরোক্ত ৬ দফা দাবিতে আগামী ১২ এপ্রিল ২০২১ সোমবার সারাদেশে স্বাস্থ্যবিধি মেনে মানববন্ধন সমাবেশ ও জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে স্মারকলিপি পেশ করা হবে। ঢাকায় ১২ এপ্রিল সকাল ১১টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে স্বাস্থ্যবিধি মেনে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হবে।


Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন

Login to comment..