‘ভিশন-মুক্তিযুদ্ধ ৭১’-এর আলোকে ‘ব্যবস্থা বদলের’ ইশতেহার ঘোষণা সিপিবির

Posted: 01 ডিসেম্বর, 2018

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) ‘ভিশন-মুক্তিযুদ্ধ ৭১’-এর আলোকে ‘ব্যবস্থা বদলের’ লক্ষ্যে ৩০ দফা কর্মসূচি বাস্তবায়নের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে। আজ ১ ডিসেম্বর ২০১৮, সকাল সাড়ে ১১টায় এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে এই নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেন দেশের বাম আন্দোলনের অন্যতম শীর্ষ নেতা বীর মুক্তিযোদ্ধা সিপিবি সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম। ঘোষণার সময় মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, ’৭১-এর বিজয় আমাদের কাছ থেকে কেড়ে নেয়া হয়েছে। ’৭১ তারুণ্যের প্রতীক, নবজীবনের প্রতীক। তারুণ্যকে সঙ্গে নিয়ে আমরা ’৭১-এর চেতনাকে পুনরুদ্ধার করব। তিনি বলেন, ভিশন-মুক্তিযুদ্ধ ৭১ বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে আমরা ’৭২-এর সংবিধানের মূলভিত্তি পুনপ্রতিষ্ঠা করব। অর্থনীতির ব্যবস্থা মুক্তিযুদ্ধের সমাজতন্ত্র-অভিমুখীন ধারায় ফিরিয়ে আনবো। ‘বটম-আপ’ ধারায় পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের পথ অনুসরণ করে গ্রাম অভিমুখীন গরিববান্ধব কার্যক্রম পরিচালনা করব, লুটের টাকা উদ্ধার করে পুনর্বণ্টন করব। বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মানুষকে মুক্ত করব। গণতান্ত্রিক বিকেন্দ্রীকরণের ভিত্তিতে রাষ্ট্রক্ষমতাকে ঢেলে সাজাবো। ‘প্রজাতন্ত্রের প্রকৃত মালিক জনগণ-সর্বক্ষেত্রে এর বাস্তবায়ন করব’। তিনি বলেন, দ্বি-দলীয় দুঃশাসনের বৃত্তে দেশ আটকা পড়ে আছে। এর পরিবর্তন না করতে পারলে মানুষের মুক্তি নেই। দেশ বাঁচাতে এই বৃত্ত ভাঙতে হবে। এজন্য রাজনৈতিক-সামাজিক-অর্থনৈতিক-সাংস্কৃতিক অবস্থা পাল্টে দিতে হবে। সিপিবি’র নির্বাচনী ইশতেহার এই পাল্টে দেয়ার দলিল, নব যৌবনের সৃজনশীল মুক্তি-আকাক্সক্ষার দলিল। ৩০ লক্ষ শহীদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে দেশকে এগিয়ে নেয়ার কাজ তরুণ সমাজকে সঙ্গে নিয়ে দেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণের দায়িত্ব পালন করবে সিপিবি। তিনি আরো বলেন, এই পরিবর্তন সম্ভব। সাম্প্রতিক সময়ে গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন, যৌন নিপীড়নবিরোধী আন্দোলন, কোটা সংস্কার আন্দোলন, নিরাপদ সড়কের দাবিতে কিশোর বিদ্রোহ, সুন্দরবন ও জাতীয় সম্পদ রক্ষায় তারুণ্যের আভিযাত্রা প্রমাণ করেছে সঠিক নির্দেশনা পেলে এই দেশকে এগিয়ে নেয়া সম্ভব। তিনি বলেন, বর্তমানে দেশ ও জনগণের প্রধান চার বিপদ ‘লুটপাটতন্ত্র, গণতন্ত্রহীনতা, সাম্রাজ্যবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা’কে পরাস্ত করব। গণতন্ত্রকে খর্ব করে ‘এক ভাগ’ মানুষের উন্নয়ন নয় বরং গণতন্ত্রকে নিরঙ্কুশভাবে কার্যকর করেই ‘নিরানব্বই ভাগ’ মানুষের শ্রমে ও ঘামে অর্থে অর্জিত অর্থনৈতিক সুফলকে ‘নিরানব্বই ভাগ’ মানুষের কাছে পৌঁছে দেব। নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন করেন সিপিবি সাধারণ সম্পাদক মো. শাহ আলম। উপস্থিত ছিলেন সিপিবি’র সহ-সাধারণ সম্পাদক কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন, প্রেসিডিয়াম সদস্য লক্ষ্মী চক্রবর্তী, আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন, অনিরুদ্ধ দাশ অঞ্জন, সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স, আহসান হাবিব লাবলু, জলি তালুকদার, সদস্য সাদেকুর রহমান শামীম ডা. সাজেদুল হক রুবেল, মো. কিবরিয়া প্রমুখ। নির্বাচনী ইশতেহারের সারাংশ-- একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন-২০১৮ বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)’র নির্বাচনী ইশতেহারের সারাংশ রুটি-রুজি অধিকারের জন্য শোষণ-বৈষম্যহীন ইনসাফের সমাজ গড়তে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্ত জনগণ যে ধরনের বাংলাদেশ নির্মাণের স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা আজও বাস্তবায়িত হয়নি। সেই স্বপ্ন হলো ‘ভিশন-মুক্তিযুদ্ধ ৭১’। এই ‘ভিশন-মুক্তিযুদ্ধ ৭১’-এর ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে বর্তমান সময়ের সুনির্দিষ্ট বাস্তবতায় তার নবায়নের মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নেয়াই আজ জাতির সামনে মৌলিক কর্তব্য। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এই স্বপ্ন বাস্তবায়নে তাদের অক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছে। এমনকি এই দুটি দলকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা দ্বি-দলীয় রাজনৈতিক কাঠামো দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। বরং যারাই ক্ষমতায় এসেছে, তারা ক্রমান্বয়ে আরও কর্তৃত্ববাদী ও স্বৈরাচারী হয়ে উঠেছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বৈষম্যহীন সমাজ ও রাষ্ট্র নির্মাণের ধারার বিপরীতে দেশে লুটপাটতন্ত্রের ধারা শক্তিশালী করেছে। বাংলাদেশে এখন মূল দ্বন্দ্ব হলো ‘এক ভাগ’ লুটপাটকারী গোষ্ঠীর সঙ্গে ‘নিরানব্বই ভাগ’ জনগণের স্বার্থের দ্বন্দ্ব। অথচ এই মৌলিক দ্বন্দ্বকে আড়াল করতে ওই ‘এক ভাগ’-এর স্বার্থরক্ষাকারী দুটি রাজনৈতিক দলের ক্ষমতার দ্বন্দ্বকে দেশের জনগণের সামনে প্রধান দ্বন্দ্ব হিসেবে বজায় রাখা হয়েছে। এই দুটি রাজনৈতিক দল একে অপরের বিকল্প নয়-তারা আসলে একই পক্ষের, তথা সমাজের ‘এক ভাগ’ লুটেরা শোষকদের স্বার্থরক্ষাকারী পক্ষের দুটি প্রধান বিবাদমান গোষ্ঠী। ‘এক ভাগ’ মানুষের পকেট ভরার তথাকথিত উন্নয়নের মডেল পরিত্যাগ করে, গণতন্ত্রকে ধারণ করেই ‘নিরানব্বই ভাগ’ মানুষের অংশগ্রহণে ও স্বার্থে সমাজতন্ত্র অভিমুখীন উন্নয়ন ধারার ‘বিকল্প পথ’ অনুসরণ করা আজ অপরিহার্য কর্তব্য হয়ে উঠেছে। জনগণের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটাতে বিদ্যমান ‘ব্যবস্থা বদল’ করা এবং দ্বি-দলীয় রাজনীতির বৃত্ত ছিন্ন করে বাম-গণতান্ত্রিক বিকল্প শক্তি-সমাবেশ গড়ে তোলা অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। এই ‘পরিবর্তন’ আজ শুধু অপরিহার্যই নয়, ‘পরিবর্তন’ আজ সম্ভবও বটে। গণজাগরণ মঞ্চের উত্থান, সাম্প্রতিক কিশোর বিদ্রোহ ইত্যাদির ভেতর দিয়ে তার প্রামাণ্য নিদর্শন পাওয়া গেছে। সিপিবি সেই নতুনের কেতন, তারুণ্যের সেই প্রাণতরঙ্গকে ধারণ করে দেশকে ‘ভিশন-মুক্তিযুদ্ধ ৭১’ বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে নিয়ে যাবে। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে, বর্তমানে দেশ ও জনগণের প্রধান চার বিপদ ‘লুটপাটতন্ত্র, গণতন্ত্রহীনতা, সাম্রাজ্যবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা’কে পরাস্ত করে এবং লুটপাটের ‘ব্যবস্থা বদল’ করে বিকল্প রাজনৈতিক কর্মসূচি ও প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন করতে সিপিবি বদ্ধপরিকর। সিপিবির আহ্বান-সেই লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়ার জন্য আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ‘কাস্তে’ মার্কায় সিপিবির মনোনীত প্রার্থীদের এবং ‘মই’ ও ‘কোদাল’ মার্কায় বাম গণতান্ত্রিক জোটের অন্য প্রার্থীদের ভোট দিয়ে বিজয়ী করুন। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বাম গণতান্ত্রিক জোটকে সঙ্গে নিয়ে ‘ভিশন-মুক্তিযুদ্ধ ৭১’-এর আলোকে ‘ব্যবস্থা বদল’-এর ৩০ দফা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করবে। ১) রাষ্ট্র পরিচালনার সব ক্ষেত্রে জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠা, বহুদলীয়, অন্তর্ভুক্তিমূলক, গণতান্ত্রিক ধারায় রাষ্ট্র পরিচালনা নিশ্চিত করা, বিচারবিভাগের পরিপূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, ক্রসফায়ার, এনকাউন্টার ইত্যাদিসহ বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ করা, গুম, খুন বন্ধ করাসহ মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সংবিধান, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা ও রাজনীতির সংস্কার সাধন করা। ২) ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন’সহ মৌলিক অধিকার খর্বকারী সব নিবর্তনমূলক কালা-কানুন বাতিল, জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালার প্রয়োজনীয় সংস্কার, সংগঠন, ধর্মঘট, সমাবেশ, মিছিল ও বিক্ষোভ প্রদর্শনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করাসহ মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠাসহ কার্যকর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা। ৩) স্থানীয় স্বশাসিত সংস্থার হাতে বাজেটের নির্দিষ্ট অংশ বিধিবদ্ধভাবে বরাদ্দ রাখার স্থায়ী ব্যবস্থাসহ তাঁদের ওপর স্ব স্ব স্তরের প্রশাসনিক ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির দায়িত্ব অর্পণ করে গণতান্ত্রিক বিকেন্দ্রীকরণ ও স্থানীয় সরকারের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা। ৪) সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থা চালু, ‘রুটিন কাজ’-এর জন্য ‘নির্বাচনকালীন সরকার’-এর বিধান সংবিধানে যুক্ত করা, মেহনতি ও দরিদ্র প্রার্থীদের নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে আর্থিক বাধাসমূহ দূর করাসহ সিপিবির ৫৩-দফা সুপারিশের ভিত্তিতে নির্বাচনী ব্যবস্থার আমূল সংস্কার করা। ৫) গরিব সহায়ক ও গ্রাম-অভিমুখীন পক্ষপাতিত্বমূলক নীতি অনুসরণ এবং সামাজিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে রাষ্ট্রীয়, সমবায়, ব্যক্তি এবং অন্যান্য মিশ্র খাতকে সহায়তা প্রদান, আঞ্চলিক ও স্থানীয়ভিত্তিক পরিকল্পনা করে নিচ থেকে উন্নয়ন পরিকল্পনা ও কার্যক্রম ‘বটম আপ’ পন্থায় পরিচালনা, বিত্তবানদের জন্য কর রেয়াত বন্ধ ও প্রত্যক্ষ করের হার বৃদ্ধি এবং সাধারণ জনগণের ওপর আরোপিত পরোক্ষ করের অনুপাত হ্রাস করা, তথ্য-প্রযুক্তি, বায়োটেকনোলজিসহ আধুনিক উন্নত প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার ও শিল্পের বহুমুখীকরণ করে বিকল্প অর্থনৈতিক নীতি ও ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠিত করা। ৬) সমবায় ও ব্যক্তিমালিকানা খাতে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, দেশের সর্বত্র সারাবছর ‘কর্মসংস্থান নিশ্চয়তা স্কিম’ চালু, দরিদ্র, অনাহারী, বেকার, অসহায় মানুষের জন্য ন্যূনতম সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত, শহর ও গ্রামের মধ্যে সুযোগ-সুবিধার বিদ্যমান বৈষম্য ক্রমান্বয়ে দূর করার মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি,দারিদ্র্য বিমোচন ও বৈষম্য হ্রাস করা। ৭) ‘ন্যায়পাল ব্যবস্থা’ চালু, ‘দুর্নীতি দমন কমিশন’-এর শক্তি ও দক্ষতা বৃদ্ধি, ঋণখেলাপিদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা, বিদেশে পাচারকৃত সম্পদ দেশে ফিরিয়ে আনা, ব্যাংক, জ্বালানি খাত ও শেয়ারবাজারে দুর্নীতি-অনিয়ম রোধ করাসহ ঘুষ-দুর্নীতি-লুটপাটের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করা। ৮) দেশব্যাপী দক্ষ ও শক্তিশালী গণবণ্টন ব্যবস্থা গড়ে তোলা, ‘টিসিবি’ ও ‘বিএডিসি’কে সক্রিয় করা, ‘উৎপাদক সমবায়’ ও ‘ক্রেতা সমবায়’ গঠন করে তাঁদের মধ্যে সরাসরি ‘মার্কেটিং’ চালু করা, ‘খাদ্য নিরাপত্তা আইন’, ‘ভোক্তা অধিকার আইন’ কার্যকর করে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও খাদ্যে ভেজাল রোধ করা। ৯) সাম্প্রদায়িক জঙ্গিবাদ রুখতে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন, মাফিয়া-গডফাদারদের দমন এবং অপরাধী চক্রের দেশি-বিদেশি অর্থ ও শক্তির উৎসসমূহ উৎপাটন করাসহ সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ-দুর্বৃত্তায়ন-মাফিয়াতন্ত্রের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করা। ১০) আমূল ভূমি সংস্কার, কৃষি সংস্কার, গ্রামীণ অর্থনীতি ও গ্রামজীবনের মৌলিক পুনর্গঠন, ভূমিহীনদের মধ্যে খাস জমির বণ্টন, আবাদী জমি সংরক্ষণ, ফসলের লাভজনক মূল্যপ্রাপ্তি, সুলভে কৃষি উপকরণের সরবরাহ, শস্যবীমা চালু, কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়া, এনজিওঋণ মওকুফ, ইউনিয়ন পর্যায়ে সরকারি ক্রয়কেন্দ্র ও কৃষিপণ্য বিপণন সমবায় স্থাপন, ক্ষেতমজুরদের ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার প্রদান, হাওরবাসীর সংগ্রামের দাবি বাস্তবায়ন ইত্যাদির মাধ্যমে কৃষি, কৃষক, গ্রামীণ মজুরের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও জীবনমান উন্নয়ন করা। ১১) বন্ধ কল-কারখানা চালু, বন্ধ হওয়া হস্তান্তরিত কারখানার পুনঃঅধিগ্রহণ, সরকারি সেক্টরে নতুন শিল্প স্থাপনের ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ, ব্যক্তিগত সেক্টরে শিল্প স্থাপনে প্রকৃত বিনিয়োগে সহায়তা প্রদান, কল-কারখানায় দুর্ঘটনা রোধ, ১৬ হাজার টাকা জাতীয় নিম্নতম মজুরি নির্ধারণ, স্থায়ী রেশনিং চালু, শ্রমিক ‘কলোনি’ নির্মাণ, ট্রেড ইউনিয়ন মাফিয়া নির্মূলসহ ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার নিশ্চিত করা, যুগোপযোগী নয়া ‘শ্রম আইন’ প্রণয়ন করে দেশীয় শিল্পের বিকাশসাধন, শ্রমিক ও কর্মচারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও জীবনমান উন্নয়ন করা। ১২) সার্বজনীন, বিজ্ঞানভিত্তিক, বৈষম্যহীন, একই ধারার গণমুখী শিক্ষাব্যবস্থা চালু, নিরক্ষরতা দূরীকরণ, শিক্ষাব্যবস্থার জাতীয়করণ, বাজেটে বরাদ্দ বৃদ্ধি, পাঠ্যপুস্তকে সাম্প্রদায়িক ও বৈষম্যমূলক উপাদান দুরীভ‚ত করা, শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ রোধ, প্রশ্নফাঁস রোধ, পিএসসি ও জেএসসি পরীক্ষা বাতিল, বিশ^বিদ্যালয়ে ৭৩-এর অধ্যাদেশের আলোকে স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করাসহ শিক্ষার প্রসার ও মানোন্নয়ন করা। ১৩) গণমুখী চিকিৎসা নীতি, স্বাস্থ্য নীতি ও ওষুধ নীতি প্রণয়ন, সরকারি স্বাস্থ্যবীমা চালু, শ্রমজীবী ও মেহনতি মানুষের জন্য বিনামূল্যে অথবা সুলভে চিকিৎসার সুযোগ বৃদ্ধি, প্রতিটি ইউনিয়নে মাতৃসদন, শিশুস্বাস্থ্য সুরক্ষা কেন্দ্র ও গণস্বাস্থ্য পরিচর্যা কেন্দ্র গড়ে তোলা, দেশজ চিকিৎসা পদ্ধতির আধুনিকায়নসহ স্বাস্থ্যখাত ও চিকিৎসার মানোন্নয়ন করা। ১৪) ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট’ যথার্থভাবে কাজে লাগানো, সৃষ্টিশীল প্রতিভাকে সুযোগ করে দেয়া, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কর্মক্ষম বেকার যুবকদের বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা, মাদকাসক্তি, সন্ত্রাস, নৈতিকতাহীনতার বিরুদ্ধে অভিযান গড়ে তোলাসহ যুবসমাজের তারুণ্য-সম্পদকে সর্বোচ্চ কাজে লাগানো। ১৫) ‘মানবাধিকার সনদ’, ‘সিডও সনদ’ (১৯৪৮), ‘ভিয়েনা সম্মেলন (১৯৯৩)’ ও ‘বেইজিং কর্মসূচি’(১৯৯৫)-এর ঘোষণা বাস্তবায়ন, ‘ইউনিফর্ম ফ্যামিলি কোড’ চালু, নারীর সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, পরিবারে ও গৃহস্থালী কাজে নারীর শ্রমের উপযুক্ত মর্যাদা ও সামাজিক স্বীকৃতি নিশ্চিত করাসহ নারী অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। ১৬) শহরের পার্ক, খেলার মাঠ পুনরুদ্ধার করে সংরক্ষণ, গ্রামাঞ্চলসহ সারাদেশে শিশুদের জন্য বিনোদন, খেলাধূলা ও স্বাস্থ্যপরিচর্যার কমিউনিটিভিত্তিক কাঠামো তৈরি, শিশুশ্রম বন্ধ করা, বৃদ্ধ নাগরিকদের জন্য পেনশন, বয়স্ক ভাতা, আবাসন কেন্দ্র, সেনিটোরিয়াম সুবিধার ব্যবস্থা করাসহ শিশু-কিশোর ও বৃদ্ধ-দুঃস্থ নাগরিকবৃন্দের অধিকার নিশ্চিত করা। ১৭) স্ব স্ব ধর্ম পালনের অধিকার নিশ্চিত করা, রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক ক্ষেত্রে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জন্য সমান মর্যাদা এবং তাঁদের পরিপূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ‘শত্রু (অর্পিত) সম্পত্তি আইন’ বাতিল করা, সব ধরনের সাম্প্রদায়িকতা নির্মূল করাসহ ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের প্রতি বৈষম্য রোধ এবং তাঁদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা। ১৮) আদিবাসী হিসেবে পূর্ণাঙ্গ সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান, মাতৃভাষা সংরক্ষণ ও মাতৃভাষায় শিক্ষাদান, ‘পার্বত্য চুক্তি’র পূর্ণ বাস্তবায়ন, হত্যা, অত্যাচারের ঘটনার বিচার, দলিতদের ওপর উৎপীড়ন ও অস্পৃশ্যতা দূর করাসহ বিভিন্ন জাতিসত্তা, আদিবাসী সমাজ ও দলিতদের যথাযথ স্বীকৃতি ও অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। ১৯) পুনর্বাসন ছাড়া নির্বিচারে বস্তি ও হকার উচ্ছেদ বন্ধ, দরিদ্র নিম্নবিত্তদের জন্য ‘গৃহনির্মাণ ঋণ প্রকল্প’ চালু, বাড়িভাড়া আইন কার্যকর, শহরগুলোতে যানজট, জলাবদ্ধতা দূরীকরণসহ শহরের বস্তিবাসী, হকার ও নাগরিকদের জীবনমান উন্নয়ন করা। ২০) প্রতিবন্ধীদের ‘ভিন্নভাবে প্রকাশিত সক্ষমতা’কে কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি করে দেয়া, ‘জাতীয় প্রতিবন্ধী নীতিমালা’ বাস্তবায়নসহ প্রতিবন্ধীদের জন্য সুযোগ সৃষ্টি ও অধিকার রক্ষা করা। ২১) অভিন্ন কলরেট ও ইন্টারনেট মূল্য নির্ধারণ, ভিওআইপি ব্যবসা বন্ধ, ইউনিয়ন পর্যায়ে ওয়াইফাই জোন তৈরি, ‘ই-গভরনেন্স’ চালু, সাইবার ক্রাইম বন্ধ করা, ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণসহ তথ্য-প্রযুক্তি, টেলিযোগাযোগ ও সামাজিক যোগাযোগ-মাধ্যমকে সার্বজনীন করা। ২২) জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা, বন-জলাভূমি দখলকারী, পাহাড় কাটার সঙ্গে সম্পৃক্তদেরসহ পরিবেশ বিনষ্টকারীদের ‘পরিবেশ আদালত’ গঠন করে বিচারের আওতায় আনা, রামপাল তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রসহ সুন্দরবন এলাকায় শিল্প-কারখানা নির্মাণ বন্ধ, নদী পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ গ্রহণসহ প্রকৃতি, পরিবেশ ও জলবায়ু রক্ষা করা। ২৩) জাতীয় সম্পদের ওপর শতভাগ মালিকানা নিশ্চিত করা, ‘খনিজ সম্পদ রফতানি নিষিদ্ধ’ আইন প্রণয়ন, বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি, দেশের সর্বত্র গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিতকরাসহ জাতীয় স্বার্থ রক্ষা ও বিকল্প জ্বালানিনীতির বাস্তবায়ন করা। ২৪) ‘জাতিসংঘ পানি প্রবাহ আইন ১৯৯৭’-এ অনুস্বাক্ষর করা, পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়, পানিনীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করাসহ পানি উন্নয়ন ও বন্যা সমস্যার প্রতিকার করা। ২৫) দুর্যোগ-পূর্ব আধুনিক সতর্কতা-ব্যবস্থা স্থাপন, আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, বিশেষায়িত উদ্ধারকর্মী দল গঠন এবং উদ্ধার-সরঞ্জামের আধুনিকায়ন, সম্ভাব্য ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতিসহ দুর্যোগ-ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন করা। ২৬) নৌপথ ও রেলপথকে অগ্রাধিকার দিয়ে যোগাযোগ-ব্যবস্থার স¤প্রসারণ ও বিকাশ, বিকল্প গণপরিবহণ-ব্যবস্থা গড়ে তোলা, সড়ক দুর্ঘটনা আইনের সংস্কারসহ নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের দাবিসমূহ বাস্তবায়ন করে সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধ, যোগাযোগ-ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও যানজট রোধ করা। ২৭) জনসংখ্যাকে সম্পদে পরিণত করা এবং জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের কার্যক্রমকে সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করা। ২৮) মানবিক, প্রগতিশীল, বিজ্ঞানমনষ্ক সাংস্কৃতিক ধারা অগ্রসর করা ও জীবনবিমুখ, ভোগবাদী অপসংস্কৃতির প্রসার রোধ করা, সাম্প্রদায়িক, প্রতিক্রিয়াশীল, কুসংস্কারমূলক ধ্যান ধারণা দূর করা, লোকজ সংস্কৃতির বিকাশ, সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলন নিশ্চিত করা, সাহিত্য-সংস্কৃতিতে কর্পোরেট আগ্রাসন বন্ধ করা, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, শিল্পকলা একাডেমি, বাংলা একাডেমির মত প্রতিষ্ঠানসমূহের কার্যক্রমকে দলীয়করণ মুক্ত করে তৃণমূল পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া, আধুনিক প্রেক্ষাগৃহ, মুক্তমঞ্চ নির্মাণসহ সাহিত্য-সংস্কৃতির বিকাশ ঘটানো। ২৯) পর্যাপ্ত খেলার মাঠের ব্যবস্থা করা, স্টেডিয়ামগুলোর মানোন্নয়ন, উপজেলা পর্যায়ে জিমনেসিয়াম এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে শরীরচর্চা কেন্দ্র স্থাপন, পর্যটন কেন্দ্রের আধুনিকায়নসহ ক্রীড়া, শরীরচর্চা ও বিনোদনের সুযোগ নিশ্চিত করা। ৩০) জোট-নিরপেক্ষ পররাষ্ট্র নীতি অনুসরণ, প্রতিবেশি দেশগুলোর সঙ্গে ঝুলে থাকা সমস্যাবলি যেমন পাকিস্তান থেকে পাওনা আদায়, আটকে পড়া পাকিস্তানি নাগরিকদের ফেরত পাঠানো, ভারত থেকে পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়, সীমান্তে হত্যা বন্ধ ও বাণিজ্যঘাটতি হ্রাস করা, রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের নাগরিকত্ব দিয়ে ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করা, ‘সার্ক’ সংস্থার কার্যক্রমকে বহুমুখী ধারায় প্রসারিত করা, তৃতীয় বিশ্বের দেশসমূহের সঙ্গে বহুমাত্রিক সম্পর্ক সম্প্রসারণ ও জোরদার করা, পূর্ণ নিরস্ত্রিকরণ-এর পক্ষে অবস্থান, বিশ্বশান্তি নিশ্চিত করা, সাম্রাজ্যবাদী ষড়যন্ত্র রুখে দাঁড়ানোসহ স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা করা।