প্রবাসীদের জীবন ও অধিকার সুরক্ষায় সরকারের ব্যর্থতা; নতজানু পররাষ্ট্রনীতি অবসান হওয়া জরুরি

Posted: 18 অক্টোবর, 2026

সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানিয়েছে গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট। 

জোটের নেতৃবৃন্দ বলেছেন, দুই বাংলাদেশি নাগরিকের গ্রেপ্তার, বিচারপ্রক্রিয়া ও মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে বাংলাদেশ সরকার ও সংশ্লিষ্ট দূতাবাসকে আগাম অবহিত না করার ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এ ঘটনা প্রবাসে বাংলাদেশের নাগরিকদের জীবন, নিরাপত্তা ও আইনগত অধিকার রক্ষায় সরকারের ভূমিকা এবং  দেশের পররাষ্ট্রনীতির কার্যকারিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।
 
আজ ১৮ অক্টোবর ২০২৬, রবিবার গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট নেতৃবৃন্দ এক যৌথ বিবৃতিতে বলেন, সৌদি কর্তৃপক্ষের বক্তব্যে দুই বাংলাদেশির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, গ্রেপ্তারের সময়, বিচারপ্রক্রিয়ার বিস্তারিত বিবরণ কিংবা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। তাঁরা  আইনজীবী নিয়োগের সুযোগ পেয়েছিলেন কি না, তাঁদের কনস্যুলার সহায়তা দেওয়া হয়েছিল কি না এবং তাঁদের পরিবারকে যথাসময়ে অবহিত করা হয়েছিল কি না এসব প্রশ্নের উত্তর জনসমক্ষে আসা জরুরি। একটি মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের মতো গুরুতর ঘটনায় স্বচ্ছতা, ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদার প্রশ্ন কোনোভাবেই উপেক্ষা করা যায় না। 

নেতৃবৃন্দ আরও বলেন, ১৯৬৩ সালের কনস্যুলার সম্পর্কবিষয়ক ভিয়েনা কনভেনশনের ৩৬ অনুচ্ছেদে বিদেশে আটক নাগরিকদের কনস্যুলার যোগাযোগ ও সহায়তার অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিধান যথাযথভাবে অনুসরণ না করা অপরাধমূলক মানবতা বিরোধী অপকর্ম। এই বিষয়ে পূর্ণাঙ্গভাবে তদন্ত ও ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। 

নেতৃবৃন্দ বলেন, বাংলাদেশ সরকার ও দূতাবাসকে অবহিত না করার ঘটনায় আন্তর্জাতিক আইনের বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘিত হয়েছে। এই বিষয়ে প্রতিকার ও ন্যায়বিচারের স্বার্থে সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পূর্ণাঙ্গ তথ্য ও ব্যাখ্যা আদায় করা অত্যন্ত প্রয়োজন।
 
বিবৃতিতে বলা হয়, এ ধরনের ঘটনায় বাংলাদেশের সরকারের দায়িত্ব কেবল মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর তথ্য চাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না।  বিদেশে বাংলাদেশের নাগরিকদের গ্রেপ্তার, বিচার ও দণ্ডের ঝুঁকির বিষয়ে যথাসময়ে তথ্য সংগ্রহ, কনস্যুলার সহায়তা নিশ্চিত করা এবং তাঁদের আইনগত অধিকার রক্ষায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করা সরকারের অপরিহার্য দায়িত্ব। 

নেতৃবৃন্দ বলেন, প্রবাসীদের জীবন ও মর্যাদা রক্ষার প্রশ্নে সরকারের নিষ্ক্রিয়তা এবং দৃশ্যমান জোরালো কূটনৈতিক পদক্ষেপের অভাব দেশের জন্য অমর্যাদাকর। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি কোনো শক্তিশালী রাষ্ট্রের প্রতি নতজানু আনুগত্যের ভিত্তিতে নয়, বরং জাতীয় মর্যাদা, পারস্পরিক সম্মান ও নাগরিকদের অধিকার সুরক্ষার ভিত্তিতে পরিচালিত হওয়া উচিত। 

ঘটনার বিষয়ে বাংলাদেশ দূতাবাসের ভূমিকা নিয়েও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন নেতৃবৃন্দ। দুই নাগরিকের বিরুদ্ধে বিচারপ্রক্রিয়া চলাকালে দূতাবাস কোনো তথ্য পেয়েছিল কি না, তাঁদের কনস্যুলার সহায়তা দেওয়ার সুযোগ ছিল কি না এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগে কোনো গাফিলতি হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে হবে। একই সঙ্গে, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর পক্ষ থেকে এ ঘটনা থেকে প্রবাসী বাংলাদেশিদের ‘শিক্ষা’ নেওয়ার বক্তব্য দায়িত্বজ্ঞানহীন ও অনভিপ্রেত। প্রবাসীদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের; সেই দায় এড়িয়ে ভুক্তভোগীদেরই সতর্কতার উপদেশ দেওয়া নিহতদের পরিবারের শোক ও বেদনাকে উপেক্ষা করার শামিল। বিদেশে নাগরিকদের অধিকার রক্ষায় রাষ্ট্রের ব্যর্থতা কোনোভাবেই তাঁদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যায় না। 

নেতৃবৃন্দ বলেন, সৌদি সরকার তাদের বিবৃতিতে শরিয়াহ আইন কার্যকরের বিষয়ে দৃঢ় অবস্থানের কথা বলেছে। অথচ সৌদি আরবে বাংলাদেশি নারী অভিবাসী কর্মীদের ওপর শারীরিক ও যৌন নির্যাতন, ধর্ষণ, জোরপূর্বক আটকে রাখা এবং বেতন না দেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে উঠে আসছে। এসব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত, অপরাধীদের জবাবদিহি এবং ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ অপরিহার্য। প্রবাসী নারী কর্মীদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগগুলোর প্রতিকার নিশ্চিত করতে সৌদি কর্তৃপক্ষের জবাবদিহি এবং বাংলাদেশ সরকারের সক্রিয় ও দৃঢ় কূটনৈতিক ভূমিকা প্রয়োজন। প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের প্রশ্নে বাংলাদেশ সরকারকে ধারাবাহিকভাবে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। 

নেতৃবৃন্দ আরও বলেন, প্রবাসী শ্রমিকদের রক্ত-ঘাম ও শ্রমে বাংলাদেশের অর্থনীতি সমৃদ্ধ হয়, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী হয়। অথচ বিদেশের মাটিতে তাঁদের জীবন, নিরাপত্তা ও মর্যাদা সুরক্ষায় রাষ্ট্র কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হলে সেই অবদান ও আত্মত্যাগের প্রতি অবিচার করা হয়। প্রবাসীদের অধিকার রক্ষা কোনো অনুগ্রহ নয়, এটি রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। বিদেশে বাংলাদেশের নাগরিকদের জীবন ও অধিকার বিপন্ন হলে সরকার  নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করতে পারে না। 

বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন, গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক ও সিপিবির সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন, সিপিবির সভাপতি সাজ্জাদ জহির চন্দন, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ, বাংলাদেশ জাসদের সভাপতি শরীফ নুরুল আম্বিয়া, সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান, বিপ্লবী কমিউনিষ্ট লীগের সাধারণ সম্পাদক ইকবাল কবির জাহিদ, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির সাধারণ সম্পাদক মোশরেফা মিশু, বাসদ (মার্কসবাদী)’র সমন্বয়ক মাসুদ রানা, বাসদ (মাহবুব)’র সাধারণ সম্পাদক হারুনার রশীদ ভূইয়া, সমাজতান্ত্রিক পার্টির নির্বাহী সভাপতি আব্দুল আলী, জাতীয় গণফ্রন্টের ভারপ্রাপ্ত সমন্বয়ক রজত হুদা, সোনার বাংলা পার্টির সভাপতি সৈয়দ হারুন অর রশীদ।