গণ-আন্দোলনের নারীরা আজ কোথাও নেই, বৈষম্য বিলোপের ধারণাও হারিয়ে গেছে

Posted: 07 মার্চ, 2026

আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রাক্কালে ‘আক্রমণ, বিদ্বেষ, আধিপত্যের বিরুদ্ধে নারীর সংগ্রাম ও আগামীর বাংলাদেশ’-শীর্ষক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। 

আলোচনা সভায় বক্তারা বলেছেন, জুলাই গণ-আন্দোলনে নারীদের বিপুল অংশগ্রহণ ও আত্মত্যাগ অপরিহার্য ছিল। কিন্তু আন্দোলনের অব্যবহিত পরেই সেই নারীরা রাষ্ট্র-রাজনীতি, সংস্কার আলোচনা ও সংসদ সর্বত্র ব্রাত্য হয়ে পড়েছে। ইতিহাসে বারবার একই রকম ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে চলেছে। 

বক্তারা আক্ষেপ করে বলেন, যে বৈষম্য বিলোপের চেতনায় সহস্র মানুষ জীবন উৎসর্গ করেছে, অল্প সময়ের মধ্যেই সেই বৈষম্য বিলোপের এজেন্ডা সব জায়গা থেকে বাদ পড়ে গেছে।

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জেলা কমিটির উদ্যোগে আজ ৭ মার্চ ২০২৬, শনিবার, বেলা ১১টায়, জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী মিলনায়তনে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় সভাপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন সিপিবির প্রেসিডিয়াম সদস্য জলি তালুকদার। বক্তব্য রাখেন, বিশিষ্ট আইনজীবী ব্যারিস্টার সারা হোসেন, প্রথিতযশা চিকিৎসক অধ্যাপক আখতার বানু, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচ্যকলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক দীপ্তি দত্ত, বাংলাদেশ বস্তিবাসী ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট কুলসুম বেগম, বাংলাদেশ কৃষক সমিতির কেন্দ্রীয় নেতা লাকি আক্তার, সিপিবি ঢাকা মহানগর দক্ষিণ নারী শাখার সম্পাদক মমতা চক্রবর্তী প্রমুখ। আলোচনা সভাটি সঞ্চালনা করেন মাহমুদা দীপা।

আলোচনা সভায় ব্যারিস্টার সারা হোসেন বলেন, নারী দিবসে আমরা অবশ্যই নির্যাতনের কথা বলবো, কিভাবে নির্যাতন প্রতিরোধ করা যায় সেটা আলোচনা করবো। কিন্তু একই সাথে আমাদের দৈনন্দিন যে সংকট- শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থানের সংকট নিরসনের কথাও বলতে হবে। 

তিনি বলেন, যে কথাগুলো আমরা দেড় বছর আগে রাস্তা-ঘাটে মিছিলে মিছিলে শুনেছিলাম- বৈষম্য নিরসন করার কথা। গত দেড় বছরে কত কিছু ঘটে গেল কিন্তু বৈষম্য নিরসনের কথা আমরা আর শুনলাম না। ফলে রাস্তা-ঘাট জনপরিসরে, কর্মক্ষেত্রে এবং পরিবারে বৈষম্য যেমন ছিল তেমনই রয়ে গেছে। এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই অব্যাহত রাখতে হবে।

সভাপ্রধান হিসেবে বক্তব্যে সিপিবির প্রেসিডিয়াম সদস্য জলি তালুকদার বলেন, পুঁজিবাদী ব্যবস্থাই একটি পুরুষতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা। যার ফলে আমরা দেখি মানুষের বহু আকাঙ্খার একটা জাতীয় নির্বাচন হলো, নারী ভোটার সংখ্যা ৫১ শতাংশের বেশি ছিল। সারা দেশে মোট প্রার্থী ছিলেন ১৯৮১ জন, সেখানে নারী মাত্র ৮৬ জন, সংসদ সদস্য হতে পেরেছেন মাত্র ৭ জন এবং বিশাল মন্ত্রিসভায় নারী আছেন ৩ জন। বর্তমান সমাজ ও রাজনীতিতে নারীর অবস্থান বোঝার জন্য এই সংখ্যাগুলোই যথেষ্ট। 

তিনি আরো বলেন, সংরক্ষিত নারী আসনে সরাসরি নির্বাচনের দাবি বহু পুরনো, সংস্কার নিয়ে বিগত দিনে বহু কথার ফুলঝুরি আমরা দেখেছি। বাস্তবতা হলো সংরক্ষিত নারী আসনে সংসদ সদস্যদের নির্বাচন করবেন সেই পুরুষ সদস্যরাই। 
জলি তালুকদার বলেন, নারীর সংগ্রামটা রাজনৈতিক এবং আগামীর বাংলাদেশ আমরা কেমন দেখতে চাই, সেটাও একটা রাজনৈতিক প্রশ্ন। নারী মুক্তি থেকে শুরু করে বৈষম্য বিলোপ এবং একটি গণতান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্র নির্মাণে, এই আদর্শিক অঙ্গীকার সম্পন্ন বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তোলা ছাড়া ভিন্ন কোনো পথ নেই। তিনি সকলকে সেই লড়াইয়ে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক দীপ্তি দত্ত উত্থাপিত ধারণাপত্রে বলা হয়, নারী কেবল পণ্য হিসেবে গণ্য হয়েছে পুঁজিপতিদের হাতে। পুঁজিবাদের কোনো বৈশিষ্টই পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থার সাথে সাংঘর্ষিক নয়।... শেখ হাসিনার পতনের আন্দোলনে নারীর অংশগ্রহণ ছিল ব্যাপকমাত্রায়। এটা অবধারিতই ছিল। কারণ, শুধু শেখ হাসিনা নয়, ইতিহাসে যে কোনো  ব্যবস্থা বদলে জন্য নারীর অংশগ্রহণকে বাধ্যতামূলক করে দেখা হয়। পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থা যেকোনো মূল্যে যে কোনো আন্দোলনকে সফল করতে নারীর অংশগ্রহণকে বাধ্যতামূলক করে তোলার প্রয়াস চালায়। এক্ষেত্রে তেমনটি হয়েছে। এর প্রমাণ পাওয়া যায় ক্ষমতাসীনদের পরিচয় বদলের পর নারীর উপর আবার আধিপত্য বিস্তারের উদাহরণগুলোতে।