Revolutionary democratic transformation towards socialism

‘অংশগ্রহণ প্রয়োজনীয় নয়’ বলে নির্বাচন কমিশনকে সিপিবি’র চিঠি প্রেরণ

ইভিএম এর কারিগরি ও ভোটদান বিষয়ে আজ ২৮ জুন ২০২২ বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) কে মতবিনিময়ে আমন্ত্রণ জানানো হয়।

আমন্ত্রণ জানানোর জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে ‘নতুন করে একই কথা বলার জন্য মতবিনিময় সভায় অংশগ্রহণ করা প্রয়োজনীয় নয়’ বলে সিপিবি’র পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
 
পার্টির সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘ইভিএম আমাদের দেশের সব মানুষের জন্য সহজসাধ্য নয় এবং সবাই এটির যথাযথ ব্যবহার করতে পারেন না। এই পদ্ধতি এখনো বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করেনি। অধিকাংশ ক্রিয়াশীল রাজনৈতিক দল ইভিএম এ ভোটদান পদ্ধতির বিরোধীতা করেছেন। তাই আগামী নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের প্রয়োজন নেই।’

চিঠিতে আরও বলা হয়েছে ‘ইভিএম একটি মাইক্রোকন্ট্রোল প্রোগ্রাম নিয়ন্ত্রিত হওয়ায়, ইভিএম নিম্নতর স্তরে নিয়ন্ত্রণ না করেও নির্বাচন নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা কিংবা প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান কর্তৃক অর্থাৎ উচ্চতর স্তরের কম সংখ্যক প্রযুক্তিবিদদের সহায়তায় কারচুপি করা যায়।’

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ইভিএম ব্যবহারের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে ইভিএম এখনো কোনো জালিয়াতি নিরোধক নয়।

‘যান্ত্রিক ত্রুটি’র যুক্তিতে ইভিএম এর মত আধুনিক যন্ত্রের মাধ্যমে কারচুপির ঝুঁকিকেও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ইভিএমকে পরিচালনা করছেন যারা, তাদের অবস্থান এবং উপরের নির্দেশকারীদের অবস্থানও ইভিএম এর ব্যবহার যথাযথভাবে হবে কি- তার উপর নির্ভর করে।

চিঠিতে আরও পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়েছে।

এছাড়া চিঠিতে বলা হয়েছে ‘বর্তমান রাজনৈতিক বিবেচনায় ইভিএম আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য প্রধান বিবেচ্য বিষয় নয়। এটিকে সামনে এনে সুষ্ঠু নির্বাচনের অন্য বিষয়েকে গৌন করে ফেলার কোনো সুযোগ নেই।

আমরা ইতোপূর্বে অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন বিষয়ে আমাদের কথা নির্বাচন কমিশনকে বলেছি।

পুনরায় বলতে চাই, জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে অবাধ নিরপেক্ষ গ্রহণযোগ্য করার জন্য সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থাসহ নির্বাচনকে টাকা-পেশীশক্তি-সাম্প্রদায়িকতা ও প্রশাসনিক কারসাজি মুক্ত করতে ব্যবস্থা নিন। নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কারে সিপিবি’র ৫৩ দফা প্রস্তাবকে বিবেচনায় নিয়ে নির্বাচন ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে উদ্যোগ নিন।

এছাড়া দলীয় সরকারের অধীনে যে সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচন হতে পারে না- তা প্রমাণিত।

তাই নির্বাচনকালীন সময়ে নির্দলীয় তদারকি সরকার গঠন, তার কার্যক্রম সুনির্দিষ্ট করা এবং নির্বাচনের আগে জাতীয় সংসদ ভেঙে দেওয়ার বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করে মতামত দেওয়ারও আহ্বান জানাচ্ছি।’


নির্বাচন কমিশনকে দেওয়া চিঠি


২৮ জুন ২০২২
বরাবর
প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও কমিশনের সদস্যবৃন্দ
নির্বাচন ভবন
আগারগাঁও, ঢাকা-১২০৭

বিষয় : ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন-এর কারিগরী ও ভোটদান বিষয়ে মতামত সভায় আমন্ত্রণ প্রসঙ্গে।

প্রিয় মহোদয়

আমাদের আন্তরিক শুভেচ্ছা জানবেন।
নির্বাচন কমিশন থেকে পাঠানো চিঠিতে আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) এর কারিগরী ও ভোটদান বিষয়ে মতবিনিময়ে আমাদের পার্টিকে আমন্ত্রণের জন্য আপনাদের ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

ইভিএম আমাদের দেশের সব মানুষের জন্য সহজসাধ্য নয় এবং সবাই এটির যথাযথ ব্যবহার করতে পারেন না। এই পদ্ধতি এখনো বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করেনি। অধিকাংশ ক্রিয়াশীল রাজনৈতিক দল ইভিএম এ ভোটদান পদ্ধতির বিরোধিতা করেছেন। তাই আগামী নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের প্রয়োজন নেই।
আমাদের কারিগরী টিমের পর্যবেক্ষণ হলো :

ইভিএম একটি মাইক্রোকন্ট্রোল প্রোগ্রাম নিয়ন্ত্রিত হওয়ায়, ইভিএম নিম্নতর স্তরে নিয়ন্ত্রণ না করেও নির্বাচন নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা কিংবা প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান কর্তৃক অর্থাৎ উচ্চতর স্তরের কম সংখ্যক প্রযুক্তিবিদদের সহায়তায় কারচুপি করা যায়।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ইভিএম ব্যবহারের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে ইভিএম এখনো কোনো জালিয়াতি নিরোধক নয়।

‘যান্ত্রিক ত্রুটি’র যুক্তিতে ইভিএম এর মত আধুনিক যন্ত্রের মাধ্যমে কারচুপির ঝুঁকিকেও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ইভিএমকে পরিচালনা করছেন যারা, তাদের অবস্থান এবং উপরের নির্দেশকারীদের অবস্থানও ইভিএম এর ব্যবহার যথাযথভাবে হবে কি-তার উপর নির্ভর করে।
 
এছাড়া-

১. নকল স্মার্ট কার্ড: নির্বাচনী কর্মকর্তার স্মার্ট কার্ডের নকল করা সম্ভব হলে তা দিয়ে দলীয় প্রার্থী ইচ্ছে মত ভোট কাস্ট করে নিতে পারবে।
২. গোপন ইভিএম সরবরাহ: প্রভাবশালীরা কেন্দ্র দখল করে সহজেই তাদের অগ্রিম ভোট দেয়া ইভিএম ভোটকেন্দ্রে সরবরাহ করে কন্ট্রোল ইউনিট প্রতিস্থাপন করে ভোটসংখ্যার আমূল পরিবর্তন ঘটাতে পারে।
৩. মাইক্রোকন্ট্রোলার চিপ নিয়ন্ত্রিত এই ইভিএমের প্রতিটি স্মার্ট কার্ডে ব্যবহৃত হচ্ছে (রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি আইডেন্টিফিকেশন) ট্যাগ।
৪.  ২০১২ সালে দিল্লি হাইকোর্ট রায় দিয়েছিলেন, এটা ‘টেম্পার প্রুফ’ (জালিয়াতি নিরোধক) নয়।
৫. হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বেন আডিডা, মাইক্রোসফট গবেষক ড. জোশ বেনালো ও পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ম্যাট ব্লেইজ বলেন, ‘ইভিএম তৈরির পর নতুন ধরনের নিরাপত্তা হামলার বিষয় জানা গেছে ও ইভিএমের নিরাপত্তার বিষয়টি পুরনো হয়ে গেছে। বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনী ফলাফলের জন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তা, স্বচ্ছতা ও যাচাইযোগ্যতা ভারতীয় ইভিএম দিতে পারে না।’
৬. বাংলাদেশে একাদশ জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম নষ্ট হয়ে যাওয়ার ফলে ভোটগ্রহণ বন্ধ হয়ে যাবার ঘটনা ছিল ব্যাপক সমালোচিত।
৭. জার্মানরা ২০০৫ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত ইভিএম ব্যবহার করলেও সমালোচনার মুখে তা বন্ধ করে। সেখানে গণনা পর্যায়ে হ্যাকিংয়ের ঘটনা ঘটেছিল।
৮. আয়ারল্যান্ডও ২০০২-২০০৪ সালে ইভিএম ব্যবহারের পরে বিতর্কের মুখে দুটি কমিশন করে এবং তারাও দেখতে পায় যে, ‘ওই ডাচ যন্ত্র বিশ্বস্ত নয়। প্রযুক্তিগত রক্ষাকবচ অপ্রতুল। কোনো একটিমাত্র সংস্থার দ্বারা ভোটদান থেকে গণনা ও ফলাফল ঘোষণা পর্যন্ত প্রক্রিয়া যাচাই করা সম্ভব নয়।
তারপরও ইভিএম নিয়ে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে আলোচনা অব্যাহত রাখা যেতে পারে।

প্রিয় মহোদয়,
বর্তমান রাজনৈতিক বিবেচনায় ইভিএম আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য প্রধান বিবেচ্য বিষয় নয়। এটিকে সামনে এনে সুষ্ঠু নির্বাচনের অন্য বিষয়েকে গৌন করে ফেলার কোনো সুযোগ নেই। 

আমরা অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন বিষয়ে আমাদের কথা অতীতে নির্বাচন কমিশনকে বলেছি।

পুনরায় বলতে চাই, জাতীয় সংসদের নির্বাচনকে অবাধ নিরপেক্ষ গ্রহণযোগ্য করার জন্য সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থাসহ নির্বাচনকে টাকা-পেশীশক্তি-সাম্প্রদায়িকতা-প্রশাসনিক কারসাজি মুক্ত করতে ব্যবস্থা নিন। নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কারে সিপিবি’র ৫৩ দফা প্রস্তাবকে বিবেচনায় নিয়ে নির্বাচন ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে উদ্যোগ নিন।
 
এছাড়া দলীয় সরকারের অধীনে যে সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচন হতে পারে না-তা প্রমাণিত।

তাই নির্বাচনকালীন সময়ে নির্দলীয় তদারকি সরকার গঠন, তার কার্যক্রম সুনির্দিষ্ট করা এবং নির্বাচনের আগে জাতীয় সংসদ ভেঙে দেওয়ার বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করে মতামত দেওয়ারও আহ্বান জানাচ্ছি।
 
উল্লেখিত বিষয়ে ইতোপূর্বে আমরা একাধিকবার উত্থাপন করেছি।

তাই নতুন করে এসব কথা বলার জন্য আমন্ত্রিত মতবিনিময় (যে মতবিনিময়ে একসাথে অনেক দলকে ডাকা হয়েছে) সভায় আমরা অংশগ্রহণ করা প্রয়োজন মনে করছি না।

আশা করি, আমাদের প্রস্তাবসমূহ বিবেচনায় নিয়ে আপনারা আপনাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করবেন।

ধন্যবাদসহ

রুহিন হোসেন প্রিন্স
সাধারণ সম্পাদক,
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)
কেন্দ্রীয় কমিটি

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন

Login to comment..