করোনা পরিস্থিতিতে সিপিবির কেন্দ্রীয় কমিটির সভায় গভীর উদ্বেগ সরকারের দায়িত্বহীনতায় জনগণ এখন চরম হুমকিতে

Posted: 12 মে, 2020

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)’র নেতৃবৃন্দ বলেছেন, বাগাড়ম্বর করে সংকটকে আড়াল করতে চাইছে সরকার। বিশেষজ্ঞ-চিকিৎসকদের মতামত এখন সরকারের কাছে গুরুত্বহীন। দানবীয় শক্তি সক্রিয়ভাবে লুটপাটে নেমে পড়ছে। করোনা মোকাবিলায় ব্যর্থতার পাশাপাশি চলছে লুটপাট। সরকারের দায়িত্বহীনতা, অদক্ষতা, সমন্বয়হীনতা, অমনোযোগিতা, অদূরদর্শীতার কারণে জনগণ এখন চরম হুমকির মধ্যে। আজ ১২ মে মঙ্গলবার অনলাইনে অনুষ্ঠিত সিপিবির কেন্দ্রীয় কমিটির এক সভায় নেতৃবৃন্দ এসব কথা বলেন। সিপিবির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ সভায় শোকপ্রস্তাব উত্থাপন করেন মো. কিবরিয়া এবং রিপোর্ট পেশ করেন সিপিবির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ শাহ আলম। করোনা মোকাবিলায় সিপিবি ও গণসংগঠনসমূহের উদ্যোগ ও কার্যক্রম সম্পর্কে রিপোর্ট পেশ করেন সিপিবির সহকারী সাধারণ সম্পাদক ও ‘কোভিড-১৯ রেসপন্স টিমে’র সমন্বয়ক কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন। সভায় আরো বক্তব্য রাখেন লীনা চক্রবর্তী, অধ্যাপক ডা. এম এ সাঈদ, রুহিন হোসেন প্রিন্স, জলি তালুকদার, মাহবুবুল আলম, মোহাম্মদ আলতাফ হোসাইন, অধ্যাপক এম এম আকাশ, মৃণাল চৌধুরী, আজহারুল ইসলাম আরজু, অ্যাড. মণ্টু ঘোষ, এনামুল হক, ডা. দিবালোক সিংহ, অধ্যাপিকা এ এন রাশেদা, এমদাদুল হক মিল্লাত, মনিরা বেগম অনু, ডা. ফজলুর রহমান, শাহরিয়ার মো. ফিরোজ, ইসমাইল হোসেন, মাকসুদা আক্তার লাইলি, কাজী রুহুল আমিন, সাদেকুর রহমান শামীম, এস এ রশীদ, রাগিব আহসান মুন্না, ডা. মনোজ দাশ, ডা. সাজেদুল হক রুবেল, হাসান তারিক চৌধুরী, আমিনুল ফরিদ, মো. কিবরিয়া, লুনা নূর, আনোয়ার হোসেন সুমন, আনোয়ার হোসেন রেজা, পরেশ কর, আবিদ হোসেন, অ্যাড. আইনুন্নাহার সিদ্দিকা, আসলাম খান, অ্যাড. মহসিন রেজা, হাফিজুল ইসলাম, জাহিদ হোসেন খান। সভায় কমরেড চন্দন দেশব্যাপী পার্টির ত্রাণ তৎপরতার সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরে তাঁর রিপোর্টে বলেন, করোনা পরিস্থিতির শুরুতেই পার্টি সারাদেশে কয়েক লাখ সচেতনতামূলক প্রচারপত্র বিলি করে। গত দুই মাসে পার্টি ও গণসংগঠনসমূহ প্রায় ৪ লাখ বোতল হ্যান্ড-স্যানিটাইজার, ৫০ হাজারের বেশি ফেইস মাস্ক বিলি করেছে। ৫০ হাজারের বেশি পরিবারকে খাদ্য সহায়তা, ফুড-কোর্ট স্থাপন করে ৫ হাজারের বেশি প্যাকেট রান্না খাবার সরবরাহ করেছে। ২৪ ঘণ্টা টেলিফোনে সেবা প্রদান করছেন পার্টির চিকিৎসক প্যানেল। দুইটি জেলায় অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস চালু করেছে। সভার প্রস্তাবে বলা হয়, কমিউনিস্ট পার্টি ও বাম গণতান্ত্রিক জোটের পক্ষ থেকে চলমান করোনা-মহাসংকটে জাতির সমস্ত শক্তি-সামর্থ্যরে সহযোগিতামূলক সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের জন্য সরকারকে আহবান জানানো হলেও, সরকার কোনো সাড়া দেয়নি। কার্যকর লকডাউন নিশ্চিত করতে নিরন্ন মানুষের ঘরে খাবার পৌঁছে দেয়া একান্ত প্রয়োজন। কিন্তু সরকার সে পথে হাঁটেনি। একেবারেই অপ্রস্তুত অবস্থায় গার্মেন্ট খুলে দিয়ে শ্রমিকদের মৃত্যুমুখে ঠেলে দেয়া হয়েছে। করোনার সংক্রমণ যখন ঊর্ধ্বমুখী, তখন স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য যথেষ্ট প্রস্তুতি ও পদক্ষেপ ছাড়াই মার্কেট, ব্যবসাকেন্দ্র, দোকানপাট, শপিংমল খুলে দেয়া হয়েছে। মালিকের মুনাফার স্বার্থ ও চাপে, আমলাতন্ত্রের দাবি-পরামর্শ ইত্যাদির ওপরে নির্ভর করে সরকার বিপজ্জনক ও আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিয়েছে। লুটেরা শক্তি ভয়ংকর গণশত্রু হিসেবে আবির্ভুত হয়েছে। কৃষককে চালের দাম থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। গার্মেন্টশ্রমিকদের ৪০% বেতন কেটে নেয়া হয়েছে। দুর্গত মানুষের জন্য বরাদ্দকৃত সহায়তা-অনুদান লুটপাট হয়ে যাচ্ছে। ত্রাণ বিতরণে নানা অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা, দলীয়করণসহ নানা গুরুতর অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। দুই কোটি পরিবারের ত্রাণসাহায্যের প্রয়োজন হলেও, মাত্র ৫০ লাখ পরিবারকে ত্রাণসাহায্য দেয়া হবে বলে সরকারিভাবে জানানো হয়েছে। প্রস্তাবে আরও বলা হয়, বর্তমানে দেশের চিকিৎসা-ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। করোনা-চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থার মারাত্মক অপ্রতুলতা রয়েছে। সমন্বয়হীনতা, চিকিৎসক-নার্সসহ স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষা-ব্যবস্থার অপর্যাপ্ততা রয়েছে। প্রয়োজনমতো করোনা-পরীক্ষার ব্যবস্থা এখনও গড়ে তোলা হয়নি। করোনা-চিকিৎসা ছাড়া অন্যান্য সাধারণ চিকিৎসা দিতেও চিকিৎসা-ব্যবস্থা চরমভাবে ব্যর্থ হচ্ছে। চিকিৎসা-ব্যবস্থার সংকট নিরসনে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে সরকার উদাসীন। সরকারের দমন-পীড়নের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে সভার প্রস্তাবে বলা হয়, সরকারের দায়িত্ব হচ্ছে করোনা সম্পর্কিত সঠিক তথ্য জনগণের মধ্যে তুলে ধরা। কিন্তু সরকার ব্যর্থতা আর লুটপাট ঢাকতে নিপীড়নের পথ বেছে নিয়েছে। লুটপাটের খবর মিডিয়ায় প্রকাশ করা এবং সামাজিক মাধ্যমে লুটপাটের বিরুদ্ধে লেখা ও সরকারের সমালোচনা করায় দেশের বিভিন্ন স্থানে বেশ কয়েকজনের বিরুদ্ধে ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে’ মামলা করা হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তিবিদ ও ‘রাষ্ট্রচিন্তা’র সদস্য মো. দিদারুল ইসলাম ভঁ‚ইয়া, কার্টুনিস্ট আহমেদ কবির কিশোর, লেখক মুশতাক আহমেদ, মিনহাজ মান্নানকে বাড়ি থেকে তুলে এনে ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে’ মামলা দেয়া হয়েছে। এর আগে ৫৪ দিন নিখোঁজ সাংবাদিক শফিকুল ইসলাম কাজল ‘উদ্ধার’ হওয়ার পর ৫৪ ধারায় গ্রেফতার দেখিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে’ মামলা করা হয়েছে। মুক্তচিন্তা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, মিডিয়ার ওপর অব্যাহত রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে দেশবাসীকে সোচ্চার হতে হবে। সভায় অবিলম্বে নিবর্তনমূলক ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন’ বাতিল এবং এই আইনে গ্রেপ্তারকৃতদের মুক্তি দাবি করা হয়।