চিকিৎসা-ব্যবস্থার সংকট নিরসনের দাবিতে স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে স্মারকলিপি দিয়েছে সিপিবি

Posted: 11 মে, 2020

চিকিৎসা-সংকট নিরসনের দাবিতে আজ ১১ মে সোমবার স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে স্মারকলিপি প্রদান করেছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)। সিপিবির সভাপতি কমরেড মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম ও সাধারণ সম্পাদক কমরেড মোহাম্মদ শাহ আলম স্বাক্ষরিত স্মারকলিপিটি স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয়ে প্রদান করেন সিপিবির প্রেসিডিয়াম সদস্য কমরেড আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন। এছাড়া ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, রংপুর, সিলেট, ময়মনসিংহ, বরিশাল, ফরিদপুর, গাইবান্ধা, বগুড়া, কুমিল্লা, মৌলভীবাজার, পটুয়াখালী, সিরাজগঞ্জ, বাগেরহাট, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নওগাঁ, মাদারীপুর, লালমণিরহাট, নেত্রকোণা, জামালপুর, রাজবাড়ি, টাঙ্গাইল, দিনাজপুর, কিশোরগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, যশোর, কুড়িগ্রাম, পিরোজপুর, নোয়াখালী, জয়পুরহাট, মাগুরা, মেহেরপুর, শেরপুর, চাপাইনবাবগঞ্জসহ সারাদেশে সিপিবির জেলা নেতৃবৃন্দ সংশ্লিষ্ট জেলা সিভিল সার্জনের মাধ্যমে একযোগে স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে এই স্মারকলিপি প্রদান করেছেন। স্মারকলিপি প্রদানের আগে জেলাগুলোতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালিত হয়। স্মারকলিপিতে কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষ থেকে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা পরিচালনায় নিয়োজিত কর্তৃপক্ষকে কোভিড-১৯ মোকাবিলা ও নিয়ন্ত্রণের জন্য পার্টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক, গবেষকদের সুপারিশমতো ২৩টি পরামর্শ দেয়া হয়। স্মারকলিপিতে সেসব পরামর্শ দেয়া হয়- সব সরকারি-বেসরকারি চিকিৎসক ও প্রতিষ্ঠানকে করোনা রোগীর চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনমত নির্দিষ্টকৃত হাসপাতালগুলোর সঙ্গে সম্পৃক্ত করা। প্রয়োজনে কেন্দ্রীয়ভাবে চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যসেবাকর্মীদের টিম তৈরি করে চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানসমূহের মধ্যে সমন্বয় সাধন করা। প্রতিটি হাসপাতালে বা চিকিৎসাকেন্দ্রে চিকিৎসক, নার্স, টেকনোলজিস্ট, ক্লিনার ও নিরাপত্তাকর্মীসহ ঝুঁঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত সব কর্মীর জন্য মানসম্পন্ন পিপিই, এন-৯৫ মাস্ক ও অন্যান্য সুরক্ষাসামগ্রী প্রাপ্তির নিশ্চয়তা প্রদান করা। করোনা রোগীর চিকিৎসায় নিয়োজিত চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক ‘কারণ দর্শাও’ নোটিশ/বদলি আদেশ প্রত্যাহার করা। সর্বসাধারণের জন্য বিনামূল্যে অথবা সুলভে মাস্ক, হ্যান্ড স্যানিটাইজার ইত্যাদি প্রাপ্তি নিশ্চিত করা। সব মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে এবং অঞ্চল/এলাকা ভিত্তিক প্রতিষ্ঠিত ও মানসম্পন্ন বেসরকারি হাসপাতালে দ্রুত (Rapid Test (CE/CDC/FDA অনুমোদিত এন্টিজেন/এন্টিবডি নির্ণয় টেস্ট অথবা করোনা আক্রান্ত কোনো দেশে কার্যকর ভূমিকা রেখেছে, এমন কোনো টেস্ট) করার অনুমতি দেয়া। যেসব বেসরকারি হাসপাতাল ল্যাবে RT-PCR-এর ব্যবস্থা আছে, সেগুলোসহ সব মেডিক্যাল কলেজের (সরকারি ও বেসরকারি) প্যাথলজিকাল ল্যাবগুলোকে ‘Biosafety Level-2’ মানে উন্নতকরণে সহায়তা দিয়ে করোনা টেস্টের ব্যবস্থা করা। করোনাভাইরাস পরীক্ষায় মাইক্রোবায়োলজিস্ট, বায়োকেমিস্ট, জিন প্রকৌশল ইত্যাদি বিষয়ে অভিজ্ঞদের সম্পৃক্ত করার ব্যবস্থা করা। প্রতিটি জেলায় কমপক্ষে একটি ‘করোনা টেস্টিং ল্যাব’ এবং প্রত্যেক উপজেলায় একটি করে স্যাম্পল সংগ্রহকেন্দ্র স্থাপন করা এবং সেসব কার্যকর করার জন্য দ্রুত প্রশিক্ষণ দিয়ে পর্যাপ্ত টেকনিশিয়ান নিয়োগ দেয়া। কোভিড-১৯ চিকিৎসার জন্য নির্ধারিত হাসপাতালসমূহে পর্যাপ্ত ICU& HDU বেড এবং Invasive & Noninvasive ভেন্টিলেটরের ব্যবস্থা করা। সাধারণ বেডগুলোর জন্য নিরবিচ্ছিন্ন হাইফ্লো অক্সিজেন থেরাপির ব্যবস্থা ও Finger Pulse oximeter-এর ব্যবস্থা করা। প্রতিটি হাসপাতালে ‘ফ্লু কর্নার’-এর পাশাপাশি ‘OPD TRIAGE System’ চালু করে সন্দেহজনক কোভিড-১৯ রোগীদের সেই হাসপাতালের আইসোলেশন বেডে রেখে কোভিড-১৯ পরীক্ষার ব্যবস্থা করা। এতে কোভিড-১৯ আক্রান্ত বা আক্রান্ত নন-সবার চিকিৎসা নিশ্চিত করা যাবে। এক্ষেত্রে পিপিই-এর যৌক্তিক ব্যবহারও নিশ্চিত করা যাবে। পাশাপাশি জরুরি Surgical & Obstetrical সেবা প্রদানে পর্যাপ্ত পিপিই-এর প্রাপ্যতা অত্যাবশ্যকীয়ভাবে নিশ্চিত করা। কোভিড-১৯ সংকট মোকাবিলায় নতুন চিকিৎসক ও নার্স নিয়োগের পাশাপাশি পর্যাপ্ত সংখ্যক টেকনোলজিস্ট ও ক্লিনার এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী দ্রুত নিয়োগ দেয়া ও তাঁদেরকে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেয়া। চিকিৎসা প্রদান, স্যাম্পল সংগ্রহ, স্যাম্পল পরীক্ষা, সঠিক নিয়মে পিপিই ব্যবহার ইত্যাদি বিষয়ে সব স্বাস্থ্যকর্মীর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। পিপিই (FFP3/FFP2/N-95 মাস্কসহ) ব্যবহারে Standard Operating Procedure (SOP) প্রস্তুত করা এবং তা সব চিকিৎসাকর্মীর কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা। চিকিৎসকদের জন্য যথাযথভাবে পিপিই ব্যবহার ও একই পিপিই একাধিকবার ব্যবহার-কৌশল, কোভিড-১৯ চিকিৎসা বিষয়ক অনলাইনে Continuous Medical Education (CME)-এর ব্যবস্থা করা এবং কোভিড-১৯ চিকিৎসায় যুক্ত হওয়ার জন্য তরুণ চিকিৎসকদের উদ্বুদ্ধ করার প্রয়াস নেয়া। নির্দিষ্টকৃত কোভিড-১৯ চিকিৎসাকেন্দ্র থেকে রোগীর ছাড়পত্র প্রদানের ক্ষেত্রে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুযায়ী সুস্থতা নির্ণায়ক (Criteria) কঠোরভাবে মেনে চলা। কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীর মৃতদেহ দ্রুত দাফন বা শেষকৃত্যের ব্যবস্থা করা। সব হাসপাতালে বা চিকিৎসাকেন্দ্রে মেডিক্যাল-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করোনা প্রতিরোধের বিধি মেনে ‘বিধিমালা-২০১৬’ অনুযায়ী বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা। সংক্রমণ বাড়তে থাকায় লকডাউন এখনই শিথিল না করে, বরং কার্যকর লকডাউন নিশ্চিত করার জন্য, উপার্জনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত এবং দুঃস্থ-দরিদ্র পরিবারগুলোকে সেনা-সহায়তায় রেশনকার্ড প্রদান করে, নিয়মিত খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা। লকডাউন শিথিল করা এবং তুলে নেয়ার ক্ষেত্রে Technical Advisory Committee ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শ করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন এবং কোভিড-১৯ সংকট নিয়ন্ত্রণে সফল দেশগুলোর উদাহরণ সামনে রেখে একটি রোড-ম্যাপ তৈরি করা। প্রয়োজনে দেশের বিভিন্ন এলাকা/অঞ্চল ভিত্তিক পরিকল্পনা তৈরি করা। দীর্ঘদিন লকডাউন চালু থাকার কারণে জনগণের মধ্যে সৃষ্ট বিভিন্ন রুগ্ণতা ও মানবিক বিষয়সমূহ যেমন-খাদ্যাভাব, পুষ্টিহীনতা, মনোবৈকল্য ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেয়া। সব বিমান ও স্থল বন্দরে বিদেশ থেকে প্রত্যাবর্তনকারী ও আগত সবাইকে বাধ্যতামূলক প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেনটাইনে রাখার ব্যবস্থা করা। শারীরিক দূরত্ব নিশ্চিত করার কাজে সক্রিয় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যবৃন্দ, গণমাধ্যমকর্মী, বিমান ও স্থল বন্দরসমূহের কর্মীদের পর্যাপ্ত পিপিই সরবরাহ করা। করোনা মোকাবিলায় ভিয়েতনাম, চীন, কিউবা, ভুটান, নেপাল, কেরালা, দক্ষিণ কোরিয়াসহ কম মৃত্যুর হারের এবং দ্রæত নিয়ন্ত্রণকারী দেশগুলোর অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে প্রতিরোধ ও চিকিৎসার জন্য (ঔষধের মাধ্যমে প্রতিরোধ-drug prophylaxis সহ) পদক্ষেপ নেয়া। সেনা বা পুলিশ সদস্যদের জন্য যেভাবে কোভিড-১৯ চিকিৎসার ক্ষেত্রে হাসপাতাল নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে, সেভাবে সব চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর জন্য হাসপাতাল বা হাসপাতালের সংরক্ষিত এলাকা নির্দিষ্ট করা। বাংলাদেশে প্রাপ্ত কোভিড-১৯-এর স্যাম্পল থেকে করোনা ভাইরাসের জেনোম সিকুয়েন্স নির্ণয়, রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা, প্রতিরোধ, প্রতিষেধক ইত্যাদি বিষয়ে গবেষণার উদ্যোগ নেয়া এবং সে জন্য পর্যাপ্ত আর্থিক বরাদ্দের ব্যবস্থা করা। করোনা রোগীর চিকিৎসায় নিয়োজিত চিকিৎসক ও অন্য স্বাস্থ্যকর্মীদের নিজ গৃহে, কর্মক্ষেত্রে যাতায়াতের জন্য পর্যাপ্ত ও উপযুক্ত পরিবহনের ব্যবস্থা করা।