করোনা প্রতিরোধে প্রধানমন্ত্রীকে স্মারকলিপি দিয়েছে সিপিবি

Posted: 26 এপ্রিল, 2020

বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাস প্রতিরোধ ও জনগণের দুর্ভোগ মোকাবিলায় সরকারের করণীয় সম্পর্কে কতিপয় পরামর্শ ও দাবি সম্বলিত স্মারকলিপি আজ ২৬ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রীকে প্রদান করেছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)। সিপিবির সভাপতি কমরেড মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম ও সাধারণ সম্পাদক কমরেড মোহাম্মদ শাহ আলম স্বাক্ষরিত স্মারকলিপিটি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রদান করেন সিপিবির প্রেসিডিয়াম সদস্য কমরেড আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন। এদিকে চট্টগ্রাম, খুলনা, সিলেট, ময়মনসিংহ, বরিশাল, ফরিদপুর, গাইবান্ধা, ঠাকুরগাঁও, কুমিল্লা, মৌলভীবাজার, পটুয়াখালী, বাগেরহাট, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, রাঙামাটি, চুয়াডাঙ্গা, নওগাঁ, ঝালকাঠি, শরীয়তপুর, লালমণিরহাট, জামালপুর, রাজবাড়ি, গোপালগঞ্জ, দিনাজপুর, পাবনা, গাজীপুর, কিশোরগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, যশোর, কুড়িগ্রাম, নোয়াখালীসহ সারাদেশে সিপিবির জেলা নেতৃবৃন্দ সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে একযোগে প্রধানমন্ত্রীকে এই স্মারকলিপি প্রদান করেছেন। স্মারকলিপিতে বলা হয়, করোনাভাইরাস সারা বিশ্বে আঘাত হেনেছে। এধরনের মহামারি গোটা বিশ্ব এবং বাংলাদেশ ইতিপূর্বে কখনো প্রত্যক্ষ করেনি। এটি একটি বৈশ্বিক দুর্যোগ, পাশাপাশি একটি জাতীয় দুর্যোগ। ফলে এই মহাসংকট পৃথিবীর কোনো একটা দেশের পক্ষে যেমন মোকাবিলা করা সম্ভব নয়, তেমনি কোনো দেশে একা সরকার বা একক কোনো দলের পক্ষে তা মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। সেজন্য প্রয়োজন সমন্বিত বৈশ্বিক ও জাতীয় উদ্যোগ। কমিউনিস্ট পার্টি ও বাম গণতান্ত্রিক জোটের পক্ষ থেকে করোনা-মহামারি মোকাবিলায় সরকার ও প্রধানমন্ত্রীকে সব দল, শক্তি ও ব্যক্তির সমন্বিত জাতীয় উদ্যোগ গ্রহণের জন্য আবেদন জানানো হয়েছে। কিন্তু সরকারের দিক থেকে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। স্মারকলিপিতে করোনা মোকাবিলায় সিপিবি ও বিভিন্ন গণসংগঠনের নানা উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে বলা হয়, কমিউনিস্ট পার্টি ও সহযোগী গণসংগঠনসমূহ জনগণের সহযোগিতায় বিপর্যস্ত মানুষের জন্য যা করেছে, তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই সামান্য। রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ ছাড়া এ মহাবিপর্যয় থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব হবে না। ‘করোনা-মহামারি’র মহাবিপর্যয় মোকাবিলার জন্য জাতির সমস্ত শক্তি-সামর্থ্য নিয়োজিত করা খুবই জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ। করোনা মহাবিপর্যয় মাকাবিলার জন্য এখনই সব শক্তিকে নিয়ে পরামর্শ সভা আহ্বান; জাতীয় বাজেট পুনর্বিন্যস্ত করে করোনা-মহাবিপর্যয় মোকাবিলার জন্য বাজেটের পর্যাপ্ত টাকা বরাদ্দ; সব উপজেলায় বিশেষায়িত ব্যবস্থাসম্পন্ন ‘টেস্টিং বুথ’ স্থাপন, করোনা পরীক্ষার জন্য দেশের প্রতিটি জেলায় অন্তত একটি করে ‘বিশেষায়িত ল্যাব’ স্থাপন; ক্ষুধার্ত ও অনাহারের আশঙ্কাসম্পন্ন পরিবারের কাছে আগামী ৩ মাস বিনামূল্যে প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দেয়া; গার্মেন্টসহ বিভিন্ন বেসরকারি কারখানা-প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক-কর্মচারীদের ১/২ মাস সবেতন ছুটি প্রদান; সরকার ঘোষিত ‘অর্থনীতি পুনরুদ্ধার প্রণোদনা’র সিংহভাগ অর্থ সরাসরি কৃষক, শ্রমজীবী, ক্ষুদে ও মধ্য বিনিয়োগকারীদের প্রদান; ইউনিয়ন পর্যায়ে ধান ক্রয়কেন্দ্র খুলে খোদ কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনা; ধান কাটতে যাওয়া ক্ষেতমজুরদের জন্য সংক্রমণ পরীক্ষার সুযোগ, স্বাস্থ্য সুরক্ষার ব্যবস্থা, থাকা-খাওয়ার বন্দোবস্ত, ১০ লাখ টাকার স্বাস্থ্যবিমা সুবিধা ইত্যাদি প্রদান; সারাদেশে প্রতিটি গ্রামে, গ্রামবাসীদের আস্থাভাজন মানুষকে সামনে রেখে, ‘গ্রাম সুরক্ষা কমিটি’ (বা এধরনের নামে) গঠন; সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অসৎ ব্যবসায়ীরা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির মাধ্যমে বাজার অস্থিতীশীল করে যাতে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির দাম বৃদ্ধি করতে না পারে, তার জন্য কঠোর নজরদারী ও শাস্তির ব্যবস্থা করা; শহরের ভাসমান দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে রান্না করা খাবার সরবরাহের নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা; করোনা সংক্রান্ত গুজব ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে হালনাগাদ বৈজ্ঞানিক তথ্য জনগণকে অবহিত করা; শুধুমাত্র সরকারি কর্মকর্তা নয়, এই দুর্যোগ মোকাবিলায় অভিজ্ঞ গবেষক ও বিজ্ঞানীদের নিয়ে ‘কোভিড-১৯ টাস্কফোর্স’ গঠন; করোনা-সৃষ্ট মানবিক বিপর্যয় রোধে সরকারের উদ্যোগে রাজনৈতিক দল, গণসংগঠন, সামাজিক সংগঠন ও মানবিক ব্যক্তিদের নিয়ে বিপর্যয় মোকাবিলায় কেন্দ্রে এবং তৃণমূলে ‘সমন্বয় কমিটি’ গঠন করাসহ স্মারকলিপিতে বিস্তারিতভাবে ১৪ দফা পরামর্শ ও দাবি উত্থাপন করা হয়। স্মারকলিপির অনুলিপি: ২৬ এপ্রিল ২০২০ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় তেজগাঁও, ঢাকা-১২১৫ বিষয় : বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাস প্রতিরোধ ও জনগণের দুর্ভোগ মোকাবিলায় সিপিবি’র কতিপয় পরামর্শ। সম্মানিত প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)’র আন্তরিক শুভেচ্ছা ও সালাম গ্রহণ করুন। করোনাভাইরাস সারা বিশ্বে আঘাত হেনেছে। মানবসমাজ তথা মানব-অস্তিত্বকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে সে আজ তার বিরুদ্ধে এক মরণযুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে। প্রতিদিন লাখো মানুষ এই ঘাতক ভাইরাসের দ্বারা আক্রান্ত হচ্ছে। হাজার হাজার আক্রান্ত মানুষ মৃত্যুর কোলে ঢোলে পড়ছে। সমগ্র বিশ্ববাসী ও সেইসঙ্গে দেশবাসী আজ ইতিহাসের ভয়াবহতম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েছে। বাংলাদেশের জনঘনত্ব বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বলে কোনোভাবে করোনা-সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়লে, তা রোধ করা কঠিন হয়ে পড়বে। এধরনের মহামারি গোটা বিশ্ব এবং বাংলাদেশ ইতিপূর্বে কখনো প্রত্যক্ষ করেনি। এটি একটি বৈশ্বিক দুর্যোগ, পাশাপাশি একটি জাতীয় দুর্যোগ। ফলে এই মহাসংকট পৃথিবীর কোনো একটা দেশের পক্ষে যেমন মোকাবিলা করা সম্ভব নয়, তেমনি কোনো দেশে একা সরকার বা একক কোনো দলের পক্ষে তা মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। সেজন্য প্রয়োজন সমন্বিত বৈশ্বিক ও জাতীয় উদ্যোগ। কমিউনিস্ট পার্টি ও বাম গণতান্ত্রিক জোটের পক্ষ থেকে করোনা-মহামারি মোকাবিলায় সরকার ও আপনাকে সব দল, শক্তি ও ব্যক্তির সমন্বিত জাতীয় উদ্যোগ গ্রহণের জন্য আবেদন জানানো হয়েছে। কিন্তু সরকারের দিক থেকে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। এদিকে, মার্চ মাসের গোড়া থেকেই বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি তার নিজস্ব কর্তব্যবোধ থেকে সারা দেশে গণসংগঠনসমূহকে সঙ্গে নিয়ে করোনা মোকাবিলায় তৎপর রয়েছে। করোনা-মহামারি বিপর্যয় নিয়ে জনগণকে সতর্ক করতে মার্চ মাসেই লাখ লাখ প্রচারপত্র ছাপিয়ে সারাদেশে শহর-গ্রামে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালিয়েছে। ১৭ মার্চ বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রে হ্যান্ড-স্যানিটটাইজার প্রকল্প চালু করে এবং তা গত ৩০ দিন ধরে চালু রেখেছে। পরে, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা, উপজেলায় বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন, বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর উদ্যোগে বহু হ্যান্ড-স্যানিটাইজার প্রকল্প চালু করা হয়। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, এ পর্যন্ত ৩ লাখ বোতল হ্যান্ড-স্যানিটাইজার উৎপাদন ও বিতরণ করা হয়েছে, যা সাধারণ মানুষসহ বড় বড় হাসপাতালে ডাক্তার, রোগীরাও ব্যবহার করছেন। বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন, বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, খেলাঘর আসর,বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র, বাংলাদেশ হকার্স ইউনিয়ন, বাংলাদেশ বস্তিবাসী ইউনিয়ন প্রভৃতি গণসংগঠন ‘স্বেচ্ছাসেবক ব্রিগেড’ গঠন করে অক্লান্তভাবে রাত-দিন কাজ করে যাচ্ছে। ৪ লাখ ৫০ হাজারেরও বেশি ফেস-মাস্ক তৈরি ও বিতরণ করা হয়েছে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় জীবানুনাশক ছিটিয়ে পরিচ্ছন্নতার দায়িত্ব পালন করছে। এলাকায়-এলাকায় হাত ধোয়ার ব্যবস্থা চালু করেছে। খুলনা, সিলেট ইত্যাদি জেলায় বিশেষ ‘ফ্রি অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস’ চালু করা হয়েছে। বাগেরহাট, খুলনা, সুনামগঞ্জ প্রভৃতি জেলায় বিশেষ ব্রিগেড গঠন করে কৃষকদের পাশে থেকে ধান কাটার কাজ চালানো হচ্ছে। কমিউনিস্ট পার্টি এবং ‘ডক্টরস ফর হেলথ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টে’র উদ্যোগে চিকিৎসকদের নিয়ে ২৪ ঘণ্টাব্যাপী ‘হেল্প লাইন’ চালু করা হয়েছে। সেখানে গত ২ সপ্তাহ ধরে প্রতিদিন টেলিফোনে বহু রোগীকে চিকিৎসা-পরামর্শ প্রদান করা হচ্ছে। কর্মহীন নিরন্ন মানুষের দ্বারে দ্বারে খাদ্য সহায়তা পৌঁছে দেয়া হচ্ছে। সারাদেশে ২৫ হাজারেরও বেশি পরিবারের কাছে খাদ্য-সহায়তা পৌঁছে দেয়া হয়েছে। কমিউনিস্ট পার্টি ও সহযোগী গণসংগঠনসমূহ জনগণের সহযোগিতায় বিপর্যস্ত মানুষের জন্য যা করেছে, তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই সামান্য। রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ ছাড়া এ মহাবিপর্যয় থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব হবে না। ‘করোনা-মহামারি’র মহাবিপর্যয় মোকাবিলার জন্য জাতির সমস্তশক্তি-সামর্থ্য নিয়োজিত করা খুবই জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ। এ অবস্থায়, সরকারের করণীয় সম্পর্কে কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষ থেকে নিম্নোক্ত পরামর্শ ও দাবি আপনার কাছে উত্থাপন করছি। (১) করোনা মহাবিপর্যয় থেকে দেশবাসীকে বাঁচানোর কাজে সরকারের পক্ষ থেকে আপৎকালীন বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এই মহাবিপর্যয় মোকাবিলার জন্য এখনই সব শক্তিকে নিয়ে পরামর্শ সভা আহ্বানসহ প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে। (২) করোনা মহাবিপর্যয়ের পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় বাজেট পুনর্বিন্যস্ত করে করোনা-মহাবিপর্যয় মোকাবিলার জন্য বাজেটের পর্যাপ্ত টাকা বরাদ্দ করতে হবে। (৩) ক) এই বরাদ্দ থেকে ১০ হাজার কোটি টাকা হাসপাতাল, যন্ত্রপাতিসহ চিকিৎসা সরঞ্জাম, প্রতিকারের ওষুধের জন্য গবেষণা, চিকিৎসক-নার্স-স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য প্রয়োজনীয় সুরক্ষা সামগ্রী এবং তাঁদের জন্য বিমা-সুবিধা ও প্রণোদনা ইত্যাদির জন্য ব্যয় করতে হবে। খ) বরাদ্দকৃত অর্থ দিয়ে সব জেলা হাসপাতালসহ সব সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে পর্যাপ্ত আইসিইউ ব্যবস্থা, রেসপিরেটর, ভেন্টিলেটর মেশিন ইত্যাদির ব্যবস্থা করতে হবে। সব উপজেলায় বিশেষায়িত ব্যবস্থাসম্পন্ন ‘টেস্টিং বুথ’ স্থাপন করে করোনা পরীক্ষার জন্য স্যাম্পেল সংগ্রহের আওতা বাড়াতে হবে। করোনা পরীক্ষার জন্য দেশের প্রতিটি জেলায় অন্তত একটি করে ‘বিশেষায়িত ল্যাব’ স্থাপন এবং এজন্য প্রশিক্ষিত জনবলের সংখ্যা বাড়াতে হবে। শ্রমজীবী মানুষের জন্য বিনা খরচে করোনা পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। গ)মৃত ব্যক্তির লাশ দ্রুত কবরস্থ/সৎকার করার উপযুক্ত ব্যবস্থা করতে হবে। (৪) যত দ্রুত সম্ভব সেনা-সহায়তায়, ক্ষুধার্ত ও অনাহারের আশঙ্কাসম্পন্ন পরিবারের তালিকা প্রস্তুত করতে হবে এবং তাঁদেরকে রেশনকার্ড প্রদান করে, আগামী ৩ মাস বিনামূল্যে তাঁদের কাছে প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দিতে হবে। এজন্য কমপক্ষে ২৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিতে হবে। (৫) গার্মেন্টসহ বিভিন্ন বেসরকারি কারখানা-প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক-কর্মচারীদের ১/২ মাস সবেতন ছুটি দিতে হবে। এ বাবদ ২৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিতে হবে। এই অর্থ গার্মেন্টসসহ শ্রমিক-কর্মচারীদের ব্যাংক-অ্যাকাউন্ট অথবা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে সরাসরি প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে। (৬) করোনা রোগী সম্পর্কে বিরূপ ধারণা দূর করতে হবে। সেজন্য অন্যান্য পদক্ষেপসহ সব ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে তথ্যের আবধ প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে। কোভিড-১৯ রোগী ও অন্যান্য রোগীর চিকিৎসার জন্য আরও সুপরিকল্পিতভাবে হাসপাতালগুলোকে বিন্যস্ত ও সমন্বিত করতে হবে এবং কোন রোগী কোথায় চিকিৎসা পাবেন তা জনগণের মধ্যে ব্যাপকভাবে প্রচার করতে হবে। কোভিড-১৯ রোগীর জন্য চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোর সার্বিক ব্যবস্থাপনা আরও উন্নত করতে হবে। সংকটাপন্ন রোগীর চিকিৎসার জন্য উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত পর্যাপ্ত পরিমাণে অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে এবং জেলা পর্যায়ের হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) স্থাপন করতে হবে। করোনা মোকাবিলার ক্ষেত্রে ভিয়েতনাম, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, নেপাল, ভারতের কেরালা রাজ্য, জার্মানি, রাশিয়া ও ইটালির ভো শহরসহ কম মৃত্যু হারের এবং দ্রুত নিয়ন্ত্রণকারী দেশগুলোতে প্রতিরোধের ও চিকিৎসার জন্য গৃহীত পদক্ষেপসমূহ থেকে শিক্ষা নিয়ে তা প্রয়োগ করতে হবে। (৭) সরকার ঘোষিত ‘অর্থনীতি পুনরুদ্ধার প্রণোদনা’র সিংহভাগ অর্থ সরাসরি কৃষক, শ্রমজীবী, ক্ষুদে ও মধ্য বিনিয়োগকারীদের প্রদান করতে হবে। (৮) ক)গ্রামাঞ্চলে বোরো ধান কাটা শুরু হয়েছে। এবার ধান ক্রয়ের কোনো শেষ তারিখ নির্ধারণ না করে, কৃষক তার খোরাকির জন্য রেখে উদ্বৃত্ত ধান যখনই বিক্রি করতে চাইবে তখনই তা সরকারকে নির্ধারিত দামে খোদ কৃষকদের কাছ হতে ক্রয় করতে হবে। এজন্য ইউনিয়ন পর্যায়ে ধান ক্রয়কেন্দ্র খুলতে হবে। গুদাম-সংকট নিরসনে অগ্রীম টাকা দিয়ে কৃষকের কাছ থেকে ধান কিনে কৃষকের গোলায় রাখার ব্যবস্থা গ্রহণ এবং অস্থায়ী ফসল-সংরক্ষণাগার স্থাপন করতে হবে। খ) ক্ষেতমজুররা যেন ধান কাটার জন্য ফসলের এলাকায় যেতে পারেন, সেজন্য তাঁদেরকে ‘স্যনিটাইজড’ বাসে নিরাপদে সেখানে আসার এবং কাজ শেষে বাড়ি ফিরে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। ক্ষেতমজুরদের জন্য সংক্রমণ পরীক্ষার সুযোগ, স্বাস্থ্য সুরক্ষার ব্যবস্থা, থাকা-খাওয়ার বন্দোবস্ত, ১০ লাখ টাকার স্বাস্থ্যবিমা সুবিধা ইত্যাদি প্রদান করতে হবে। এসব ক্ষেতমজুর পরিবার চিহ্নিত করে তাঁদেরকে রেশন কার্ডের মাধ্যমে ৩ মাস বিনা মূল্যে খাদ্যসামগ্রী সরবরাহ করতে হবে। গ) ক্ষেতমজুরদের ন্যায্য মজুরি প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে। কৃষক যেন তা দিতে পারেন, সেজন্য কৃষককে আগেভাগেই সরকার ঘোষিত অনুদানের টাকা এবং বিনা সুদে ঋণপ্রদান করতে হবে। ঘ) বর্তমান সংকটকালে ক্ষুদ্র ও মাঝারি সবজি-চাষি, পোল্ট্রি, ডেইরি ও গবাদিপশু খামারীকে জনপ্রতি ১০ হাজার টাকা সরাসরি সহায়তা প্রদান করতে হবে। প্রকৃত কৃষক ও খামারীদের জন্য ২% সরল সুদে ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। ঙ) করোনা-মহাবিপর্যয়ে মানুষের বিপর্যস্ততার সুযোগে ফসল,গরু-ছাগল, জমি-জমা-সম্পত্তি স্বাভাবিক দামের চেয়ে কম দামে কিনে নেয়া (ডিসট্রেস সেইল) বেআইনি ঘোষণা করে, তা কঠোরভাবে রোধ করতে হবে। (৯) সারাদেশে প্রতিটি গ্রামে, গ্রামবাসীদের আস্থাভাজন মানুষকে সামনে রেখে, ‘গ্রাম সুরক্ষা কমিটি’ (বা এধরনের নামে) গঠন করে গ্রামবাসীদের সহযোগিতা ও অংশগ্রহণে সেগুলোকে তৎপর করতে হবে। তাদের কাজ হবে- ক) সরকারি বরাদ্দ যেন ‘উপযুক্ত পরিবার’ ছাড়া অন্য কারও হাতে না যায়, তা নিশ্চিত করা। খ) ‘গ্রামের কোনো মানুষকে না খেয়ে মরতে দেব না’-এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে চাল-ডাল ইত্যাদি দ্রব্যের আপৎকালীন মজুদ হিসেবে ‘জনভাÐার’ গড়ে তোলা। ক্ষুধার্র্ত পরিবারগুলোকে তা পৌঁছে দেওয়া। গ)মানুষ যেন গ্রামে ঢোকার মুখে প্রতিবার হাত ধুয়ে গ্রামে প্রবেশ করেন, তা নিশ্চিত করার জন্য উপযুক্ত স্থানে সাবান, পানি, গামছা ইত্যাদি রাখার ব্যবস্থা করা। ঘ)প্রাথমিক চিকিৎসা সহায়তার জন্য এলাকার ডাক্তার, কম্পাউন্ডার, কবিরাজ প্রমুখদেরকে সজাগ রাখা, ওষুধের দোকান খোলা রাখার ব্যবস্থা ইত্যাদি বিষয় দেখভাল করা। উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন হলে কোথায় যোগাযোগ করতে হবে তা আগে থেকে জেনে রাখা। ...ইত্যাদি। ঙ)শহরের পাড়া-মহল্লাগুলোতেও স্থানীয়ভাবে একই রকমের উদ্যোগ নেওয়া। (১০) সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অসৎ ব্যবসায়ীরা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির মাধ্যমে বাজার অস্থিতীশীল করে যাতে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির দাম বৃদ্ধি করতে না পারে, তার জন্য কঠোর নজরদারী ও শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। (১১) শহরের ভাসমান দরিদ্র জনগোষ্ঠী যাঁদের রান্না করে খাওয়ার কোনো ব্যবস্থা নেই, তাঁদের রান্না করা খাবার সরবরাহের নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে হবে। (১২) করোনা সংক্রান্ত গুজব ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে হবে এবং হালনাগাদ বৈজ্ঞানিক তথ্যগুলো সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করতে চেষ্টা করতে হবে। করোনার সময় অন্যান্য রোগে আক্রান্ত জনগণও যাতে চিকিৎসাসেবা পায়, সে দিকে নজর দিতে হবে। যাঁরা উপযুক্ত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, তাঁদের পাশে দাঁড়াতে হবে, তাঁদের চিকিৎসায় সহায়তা করতে হবে। (১৩) শুধুমাত্র সরকারি কর্মকর্তা নয়, এই দুর্যোগ মোকাবিলায় অভিজ্ঞ গবেষক ও বিজ্ঞানীদের নিয়ে ‘কোভিড-১৯ টাস্কফোর্স’ গঠন করতে হবে। দেশীয় গবেষকদের এ সংক্রান্ত গবেষণায় সর্বোচ্চ সহযোগিতা করতে হবে। করোনা শনাক্তের কিট উৎপাদন, প্রতিষেধক তৈরির গবেষণাকে উৎসাহ দিতে হবে ও এজন্য বিশেষায়িত ল্যাবরেটরি তৈরি করতে হবে। (১৪) করোনা-সৃষ্ট মানবিক বিপর্যয় রোধে সরকারের উদ্যোগে রাজনৈতিক দল, গণসংগঠন, সামাজিক সংগঠন ও মানবিক ব্যক্তিদের নিয়ে বিপর্যয় মোকাবিলায় কেন্দ্রে এবং তৃণমূলে ‘সমন্বয় কমিটি’ গঠন করে ঐক্যবদ্ধভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে। স্থানীয় উদ্যোগগুলো সমন্বয় করতে এবং সমগ্র দেশ ও দেশের মানুষের শক্তিকে পরিপূর্ণভাবে কাজে লাগাতে হবে।