ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর সফর, বিশ্ব পরিবেশ দিবস এবং সুন্দরবনধ্বংসী প্রকল্প বিষয়ে ‘সাংবাদিক সম্মেলন’

Posted: 03 জুন, 2015

প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ, আগামী ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস। ১৯৭২ সালে জাতিসংঘের মানবিক পরিবেশ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সম্মেলনে গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির (ইউএনইপি) উদ্যোগে প্রতিবছর সারা বিশ্বের ১০০ টিরও বেশি দেশে ৫ জুন ‘বিশ্ব পরিবেশ দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সংগঠন নানা ধরনের কর্মসূচি পালন করবে। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য ‘Seven Billion Dreams. One Planet Consume with Care’ অর্থাৎ ‘৭০০ কোটি স্বপ্ন। একটাই পৃথিবী। ভোগ কর যত্নের সাথে।’ আমরা জানি, প্রতিবছরের মতো এবারও বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী পরিবেশ রক্ষার গুরুত্ব উল্লেখ করে পৃথক পৃথক বাণী দিবেন, বৃক্ষরোপণের কর্মসূচি পালন করবেন, সরকারের বিভিন্ন দপ্তর সভা-সেমিনার ও বর্ণাঢ্য র্যা লীর আয়োজন করবে। কিন্তু তাদের এই মৌখিক আহবান ও আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি যখন পালন করা হবে, তখনও সারাদেশ জুড়ে চলবে পরিবেশ ধ্বংসকারী নানা সরকারি বেসরকারি তৎপরতা। উন্নয়নের নামে নদী দখল ও ভরাট, কলকারখানা থেকে অবাধে বিষাক্ত বর্জ্য নির্গত হতে দেয়া, নদী ভরাট করে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য রাস্তা নির্মাণ, পাহাড় কাটা, বন ধ্বংস ইত্যাদি কিন্তু এক মুহূর্তের জন্যও বন্ধ হবে না, এমনকি পরিবেশ দিবসের দিনও না। যতটা আনুষ্ঠানিকতা নিয়ে পরিবেশ দিবস পালন করা হয়, তার থেকে বেশি উৎসাহ উদ্দীপনা নিয়ে চলে পরিবেশ ধ্বংসকারী এসব তৎপরতা। এসব নিয়ে কোনো যৌক্তিক আপত্তি উত্থাপন করলে তাদের ‘উন্নয়ন বিরোধী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, বলা হয় তারা পশু পাখি গাছপালা নিয়ে চিন্তিত, মানুষ নিয়ে নন! সাংবাদিক বন্ধুগণ, পরিবেশ রক্ষায় সরকারের বিভিন্ন অঙ্গীকার, বাণী ও আনুষ্ঠানিক কর্মসূচিকে সরকারেরই যে প্রকল্পটি সবচেয়ে বেশি প্রশ্নবিদ্ধ করে তা হলো সুন্দরবনকে বিপদাপন্ন করে সুন্দরবনের পাশে ভারতের এনটিপিসির নেতৃত্বে যৌথ উদ্যোগে রামপাল কয়লা ভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প। আর তার পেছনে এখন যুক্ত হয়েছে ওরিয়ন প্রকল্প। সুন্দরবনের পাশে রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিরুদ্ধে দেশের ভেতরে প্রবল জনমত, দেশি-বিদেশী বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ, ব্যক্তি ও সংগঠনের আপত্তি সত্ত্বেও ভারত-বাংলাদেশ যৌথ উদ্যোগে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসছে না সরকার। সম্প্রতি বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের জন্য আন্তর্জাতিক টেন্ডার আহবান করা হয়েছে। এরমধ্যে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের প্রস্তুতি মূলক কাজও চলছে। মূল কেন্দ্র নির্মাণের আগে মাটি ভরাট ড্রেজিং ইত্যাদি প্রস্তুতিমূলক কাজে খুব বেশি পরিবেশ দূষণ হওয়ার কথা না। কিন্তু এই প্রস্তুতিমূলক কাজের ফলে সৃষ্ট পরিবেশ দূষণটুকুও নিয়ন্ত্রণ করা হয়নি বলে খোদ সরকারি মনিটরিং রিপোর্টেই স্বীকার করা হয়েছে! বালি ভরাটের সময় ধুলো নিয়ন্ত্রণ, ড্রেজিং এর সময় শব্দ দূষণ ও কালো ধোঁয়া নিয়ন্ত্রণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, মৎস্য সম্পদ রক্ষা ইত্যাদির জন্য যেসব পদক্ষেপ নেয়ার কথা ছিল, তার কোনটাই পালন করা হয়নি বলে স্বীকার করা হয়েছে সরকারেরই নিয়োগ করা প্রতিষ্ঠান সিইজিআইএস এর নভেম্বর ২০১৪ সালের মনিটরিং রিপোটে। এই দূষণগুলোর জন্য হয়তো সুন্দরবন ধ্বংস হয়ে যাবে না, কিন্তু এগুলো স্পষ্টতই দেখায় যে, বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু হলে সুন্দরবনের কী ঘটবে। প্রস্তুতি পর্যাযেই যদি এই অবস্থা হয় তাহলে, যখন বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ হবে, যখন তা পুরোদমে চালু হবে, যখন প্রতিদিন হাজার হাজার টন সালফার নাইট্রোজেন গ্যাস, ছাই, কয়লা ধোয়া পানি নির্গত হবে তখন কী ঘটবে তা অনুমান করতে অসুবিধা হয় না। বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে নির্গত বিষাক্ত উপাদান ছাড়াও রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের আরেকটি বিপদ হলো সুন্দরবনের মধ্যে দিয়ে কয়লা পরিবহণ। কয়লা পরিবহণ করতে গিয়ে যদি দুর্ঘটনা ঘটে তাহলে কী পরিস্থিতি তৈরী হবে তার নমুনা আমরা দেখেছি গত ৯ ডিসেম্বর ২০১৪। ঐদিন শ্যালা নদীতে তেলের ট্যাংকার এবং ৩ মে ২০১৫ তারিখে সুন্দরবনের ভোলা নদে সার বোঝাই জাহাজ ডুবির ঘটনার পর তেল/সার ছড়িয়ে পড়া, দূষণ নিয়ন্ত্রণের কোন ব্যবস্থা গ্রহণ না করা ও ডুবে যাওয়া জাহাজ উদ্ধারে মারাত্মক অবহেলা ও সমন্বয়হীনতা থেকেই স্পষ্ট যে শুধু কয়লা পরিবহণই সুন্দরবনের জন্য কতোবড় বিপদ আনতে পারে। ৯ ডিসেম্বরের একটি দুর্ঘটনা সুন্দরবনে যে ভয়াবহ ও দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি ঘটিয়েছে তা দেশি বিদেশি সকল বিশেষজ্ঞরাই দেখিয়েছেন। এরপরও গত ৬ এপ্রিল থেকে সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে আবারও তেলবাহী জাহাজ চলাচলের অনুমতি প্রদান থেকে বোঝা যায় সরকারের কাছে সুন্দরবনের কোনো গুরুত্ব নেই। সাংবাদিক বন্ধুগণ, কিন্তু সুন্দরবনের গুরুত্ব এদেশের মানুষ জানে, জানে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ সংশ্লিষ্ট সকল আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান। তাই সুন্দরবনের পাশে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের বিপদ নিশ্চিত জেনে রামসার ও ইউনেস্কোর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থা তাদের উদ্বেগ প্রকাশ করে সরকারকে একাধিক বার চিঠি দিয়েছে। এছাড়া সুন্দরবনের জন্য বিপদজনক রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের সাথে সংশ্লিষ্টতার কারণে ভারতীয় কোম্পানি এনটিপিসি থেকে নরওয়ে সরকারের গ্লোবাল পেনশন ফান্ড বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে নিয়েছে। এমনকি প্রথমদিকে খোদ সরকারের বিভিন্ন বিভাগও লিখিত ভাবে রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ব্যাপারে আপত্তি জানিয়েছিলো! কিন্তু কতিপয় দেশি বিদেশি গোষ্ঠীর মুনাফা উন্মাদনা সরকারকে বধির করেছে, সুন্দরবন ধ্বংসের আয়োজন আরও জোরদার হয়েছে। রামপাল প্রকল্প সামনে রেখে ওরিয়নের কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, শীপইয়ার্ড, সাইলো, সিমেন্ট কারখানাসহ নানা বাণিজ্যিক ও দখলদারী অপতৎপরতা বাড়ছে। সাংবাদিক বন্ধুগণ, এই পরিস্থিতিতে আগামী ৬ জুন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশ আসছেন। ভারত বাংলাদেশ যৌথ উদ্যোগের এই রামপাল তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য সুন্দরবনের সামনে যে বিপদ, তার জন্য বাংলাদেশ সরকারের পাশাপাশি ভারত সরকারও সমান দায়ী। বাংলাদেশে সুন্দরবনের ১৪ কিমি এর মধ্যে এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এনটিপিসি এ ধরনের কোনো প্রকল্প ভারতে করতে সক্ষম হতো না, কেননা ভারতের ‘ইআইএ গাইডলাইন ২০১০’ অনুসারে বনাঞ্চলের ২৫ কিমি-র মধ্যে কোন বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করা যায় না। ভারতে পরিবেশ আইন অনুসারে এনটিপিসির একাধিক প্রকল্প বাতিল করতে হয়েছে। আমরা ভারতের আইন ভঙ্গ করে ভারতীয় কোম্পানির সুন্দরবনধ্বংসী তৎপরতার প্রতি ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করি এবং তা অবিলম্বে বন্ধের দাবি জানাই। আমরা এখনও আশা করি দুদেশের সরকার বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বন, কয়েক কোটি মানুষের প্রাকৃতিক নিরাপত্তা বাঁধ এই সুন্দরবনের গুরুত্ব উপলব্ধি করবেন এবং এই বিধ্বংসী তৎপরতা থেকে সরে আসবেন। আমরা তাই ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন বাংলাদেশ সফরের সময় সুন্দরবনধ্বংসী বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিলের ঘোষণা দেওয়ার জন্য দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানাই। তা নাহলে বাংলাদেশে এবং বাংলাদেশ-ভারতের জনগণের যৌথ উদ্যোগে প্রতিরোধ আন্দোলন জোরদার করতে আমরা বাধ্য হবো। কোনোভাবেই আমরা বাংলাদেশ, ভারত ও সারাবিশ্বের এই প্রাকৃতিক সম্পদ ধ্বংস হতে দিতে পারি না। কেননা আমরা বারবার বলি: বিদ্যুৎ উৎপাদনের বহু বিকল্প আছে, কিন্তু সুন্দরবনের কোন বিকল্প নেই। • আমরা এবছরের ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবসের সকল অনুষ্ঠানে রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্পসহ সুন্দরবনধ্বংসী সকল অপতৎপরতা বন্ধের দাবি সামনে আনার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহবান জানাই। • ভারতের প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফরকালে দুদেশের প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমাদের দাবি, আপনারা যৌথভাবে রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল ঘোষণা করুন এবং দুদেশের সুন্দরবন বিকাশে কর্মসূচি নিন। • আগামী ১৪ জুন মাগুড়ছড়া দিবস। মাগুড়ছড়া ও টেংরাটিলায় গ্যাস সম্পদ ধ্বংসের জন্য শেভ্রন ও নাইকোর কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় এবং সুন্দরবন রক্ষাসহ জাতীয় কমিটির ৭ দফা দাবিতে দেশব্যাপী সমাবেশ ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালিত হবে। এইদিন পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি ৩ জুন ২০১৫, প্রগতি সম্মেলন কক্ষ, মুক্তি ভবন, ঢাকা।