ডিজিটাল আইন ২০১৮, কালো আইনের পরিবর্তে কুচকুচে কালো আইন প্রবর্তন করা হচ্ছে সংবাদ সম্মেলনে সিপিবি-বাসদ ও গণতান্ত্রিক বাম মোর্চা

Posted: 01 ফেব্রুয়ারী, 2018

ডিজিটাল আইন ২০১৮ কে মত প্রকাশ ও প্রচারের স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক অধিকার পরিপন্থী বলে উল্লেখ করে অবিলম্বে এ আইন বাতিল দাবি করেছেন। মৈত্রী মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত সিপিবি- বাসদ- গণতান্ত্রিক বাম মোর্চা আয়োজিত প্রেস কনফারেন্সে উপস্থিত ছিলেন মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, খালেকুজ্জামান, সাইফুল হক, শুভ্রাংশু চক্রবর্তী, আব্দুল আজিজ, ফিরোজ আহমেদ, হামিদুল হক। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন মোশরেফা মিশু। সংবাদ সম্মেলনে মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, দেশের মানুষ কালো আইন আইসিটি অ্যাক্ট-৫৭ ধারা বাতিল চেয়েছিলেন কিন্তু তাদের উপর কুচকুচে কালো আইন চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে। এই আইন সংবিধান, তথ্য অধিকার আইন সহ সকল গণতান্ত্রিক অধিকার ধ্বংস করবে। অবিলম্বে এই আইন বাতিল করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এই আইন জনগণের গণতান্ত্রিক আকাংখার সাথে বিশ্বাসঘাতকতার সামিল। অবিলম্বে এই আইন বাতিল করুন নতুবা জনগণ আপনাদেরকে বাতিল করে দেবে। খালেকুজ্জামান বলেন, অসংখ্য কালো আইন দ্বারা গণতান্ত্রিক অধিকার ইতিমধ্যেই সংকুচিত করা হয়েছে, এখন ডিজিটাল আইনের নামে তাকে শৃংখলিত করা হচ্ছে। এই আইন মন্ত্রী এমপি, প্রশাসনিক কর্মকর্তাসহ ক্ষমতাসীনদের লুটপাটকে সুরক্ষা দেয়ার লক্ষ্যে প্রণীত হয়েছে। সাইফুল হক বলেন, সমালোচনা করার সুযোগ কেড়ে নেয়া এবং ক্ষমতাসীনদের লুটপাটকে জবাবদিহীতার উর্ধে রাখার লক্ষ্যে এই আইন প্রণয়ন করা হচ্ছে। শুভ্রাংশু চক্রবর্তী এই আইনকে ফ্যাসীবাদ প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে প্রণীত আইন বলে উল্লেখ করেন। নেতৃবৃন্দ এই অগণতান্ত্রিক কালো আইন বাতিলের লক্ষ্যে সাংবাদিক, আইনজীবী, শিক্ষক সহ সকলকে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহবান জানান। সংবাদ সম্মেলন থেকে ডিজিটাল আইন ২০১৮ বাতিল করার দাবিতে আগামী ৪ ফেব্রুয়ারি প্রতিবাদ সমাবেশের কর্মসুচি ঘোষণা করা হয়। সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্য: ডিজিটাল আইন ২০১৮ প্রসঙ্গে সিপিবি-বাসদ-গণতান্ত্রিক বাম মোর্চার সংবাদ সম্মেলন প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ সিপিবি-বাসদ-গণতান্ত্রিক বাম মোর্চার পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা গ্রহণ করুন। ভাষার মাসের প্রথম দিনে দেশের জনগণের মুক্তবুদ্ধি চর্চা, মতপ্রকাশের যুক্তিসঙ্গত সমালোচনারঅধিকার কেড়ে নেয়ার এক ভয়ংকর আইন প্রসঙ্গে আমাদের মাতামত আপনাদের মাধ্যমে দেশবাসীর সামনে তুলে ধরার জন্য আমরা এই সংবাদ সম্মেলনে হাজির হয়েছি। ২৯ জানুয়ারি মন্ত্রী পরিষদে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮এর খসড়া চূূড়ান্ত অনুমোদন পেয়েছে। আইনটি সংসদে পাস হলে আইসিটি অ্যাক্টের ৫৪,৫৫, ৫৭ ও ৬৬ ধারা বিলুপ্ত হবে। মন্ত্রী পরিষদ সচিব সাংবাদিকদের জানান, ‘সাইবার ক্রাইমের আধিক্য এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির মতো ঘটনা ঘটেছে ফলে এ আইন করার প্রয়োজন হয়েছে। আগে সাইবার ক্রাইমের জন্য কোন আইন ছিল না। এখন এই জাতীয় সব অপরাধের বিচার এই আইনের আওতাভুক্ত করা হয়েছে।’ তিনি আরও জানান, ‘আইনে ডিজিটালের সংজ্ঞা, ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব, ইমারজেন্সি রেসপন্স টিম গঠন, প্রধান মন্ত্রীর নেতৃত্বে ১১ সদস্যের একটি ডিজিটাল নিরাপত্তা কাউন্সিল গঠনের কথা বলা হয়েছে। নতুন আইনের ১৭ থেকে ৩৮ ধারায় বিভিন্ন অপরাধ ও শাস্তির বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে।’ এই সব কথা আপাত অর্থে নিরীহ মনে হলেও অতীতের স্মৃতি এবং সরকারের বর্তমান ভূমিকার সাথে আইনটিকে দেখে আতঙ্কিত না হওয়ার কোন কারণ নেই। রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী কর্তৃক সমালোচনাকারিদের ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করা, সিঁধেল চোর, গাধার সাথে তুলনা করা তো আছেই মামলার মাধ্যমে হয়রানি বর্তমানে এক ভয়াবহ মাত্রায় উন্নীত হয়েছে। ফেসবুকের মাধ্যমে মিথ্যা তথ্য দিয়ে উত্তেজনা সৃষ্টি করে সাথিয়া, রামু, নাসির নগর, রংপুরে সাম্প্রদায়িক হামলা নির্যাতনের সুস্পষ্ট প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও দায়ীদের না ধরে নিরীহ ব্যক্তিদের হয়রানি, আইসিটি অ্যাক্টের ৫৭ ধারার মাধ্যমে হয়রানি, আইসিটি অ্যাক্টের অধীনে ৭৪০টি মামলার ৬০ শতাংশেরও বেশি ৫৭ ধারায় করার ফলে সকল মহল থেকেই এই ধারা বাতিলের পক্ষে প্রবল জনমত গড়ে উঠেছিল। কিন্তু যে খসড়া আইন অনুমোদিত হয়েছে তা গণতান্ত্রিক অধিকারকে আরও সংকুচিত করার ক্ষেত্রে শাসকদের হাতে শক্তিশালী অস্ত্র তুলে দিল। উন্নয়নের প্রবল হট্টগোলে গণতন্ত্র যখন হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম তখন উন্নয়ন আর দুর্নীতির মেল বন্ধনকে নিরাপদ করতে এই আইন ব্যবহৃত হবে। আইনের শাসনের নামে শাসন করার আইন প্রনয়ণ, আইনের গতি বাড়ানো কমানো, আইনকে শাসকদের ইচ্ছা অনুযায়ী পরিচালনা করার দৃষ্টান্ত জনগণ দেখছে। এবারের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮ শাসকদের সাথে দুর্নীতিবাজদেরও নিরাপত্তা দেবে। আইনের ১৭ ধারায়Ñডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে কেউ যদি জনগণকে ভয়ভীতি দেখায় এবং রাষ্ট্রের ক্ষতি করে তাহলে ১৪ বছরের জেল ও এক কোটি টাকা জরিমানা বা উভয় দ- দেয়ার বিধান রাখা হয়েছে। ২৮ ধারায়- কেউ যদি ধর্মীয় বোধ ও অনুভূতিতে আঘাত করে তাহলে তাকে ১০ বছরের জেল ও ২০ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড দেয়ার বিধান। ২৯ ধারায়- কেউ মানহানিকর কোন তথ্য দিলে তার বিরুদ্ধে ৩ বছরের জেল ও পাচ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড দেয়ার বিধান। ৩১ ধারায়- ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে কেউ অরাজকতা সৃষ্টি করলে ৭ বছরের জেল ও পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান। ৩২ ধারায়- সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে কেউ যদি বেআইনি প্রবেশ করে কোন ধরনের তথ্য উপাত্ত যে কোন ধরনের ইলেকট্রনিক্স যন্ত্রপাতি দিয়ে গোপনে রেকর্ড করে তাহলে সেটা গুপ্তচরবৃত্তির অপরাধ হবে। এর জন্য ১৪ বছরের জেল ও ২০ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান। একটি ধারা পর্যালোচনা করলেই দেখা যায় দেশের ডিজিটাল উন্নয়নের কথা যত প্রকাশ্যভাবে বলা হচ্ছে, জনগণকে ও সংবাদ মাধ্যমকে ডিজিটালি নিয়ন্ত্রণ করার কালাকানুন ততটাই সন্তঃপর্ণে তৈরি করা হচ্ছে। এ আইনের খসড়া প্রণয়ন করার সময় সমাজের কোন অংশের মতামত নেয়া হয়নি। আমলাতন্ত্রের ওপর ভর করে ক্ষমতাসীন সরকারের ইচ্ছা বাস্তবায়ন ও নিয়ন্ত্রণ কঠোর করার লক্ষ্যেই এই আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। সংসদে আইনটি পাশ করার আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হলে এআইনমত প্রকাশের যে সামান্য সুযোগ আছে তাকে আরও সংকুচিত করে ফেলবে। জনগণের কথা বলে অতীতে শাসকগোষ্ঠী প্রচার মাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণের জন্য যত আইন প্রণয়ন করেছে, তার ফলে যুক্তিসংগ সমালোচনা, মুক্তবুদ্ধির চর্চা, বার বার খর্বিত হয়েছে। ব্রিটিশ লেফটেন্টে গভর্নর রিচার্ড টেম্পল নাটক মঞ্চায়নকে নাশকতামূলক কার্যকলাপ উল্লেখ করেন। তার সুপারিশ অনুযায়ী ১৮৭৬ সালে অভিনয় নিয়ন্ত্রণ আইন প্রণয়ন করা হয়। এর পর ভারত রক্ষা আইন ডিফেন্স রুল অব পাকিস্তান, বিশেষ ক্ষমতা আইন, সন্ত্রাস দমন, আইনসহ যত আইন প্রণয়ন করা হয়েছে, সবই জনগণের নামে, জনগণ দমন ও শাসক রক্ষা আইন হিসেবেই কাজ করেছে। এবারের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮ অনুমোদিত হওয়ার পর আইনমন্ত্রী বলেছেন, যে তার মনে হয় এ আইনে সাংবাদিকদের কোন সমস্যা হবে না। এ মনে হওয়ার কোন ভিত্তি কী আছে? এ আইন সংবিধানের ও গণতান্ত্রিক অধিকারের সাথে সাংঘর্ষিক। আর এক মন্ত্রী স্পষ্টভাবেই সত্য কথা বলেছেন। এমপিদের মান-ইজ্জত বাঁচানোর জন্য এ আইন করা হয়েছে। সংবাদ মাধ্যমে একথা বলে তাদের প্রকৃত উদ্দেশ্যকে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন। প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ আমরা সিপিবি-বাসদ-গণতান্ত্রিক বাম মোর্চ দীর্ঘদিন ধরেই দুর্নীতি-দুঃশাসন মুক্ত, গণতান্ত্রিক অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠনে মুক্ত বুদ্ধির চর্চা, প্রচার মাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য আন্দোলন করে আসছি। দেশের অর্থনীতিতে লুটপাট, মুষ্টিমেয় মানুষের হাতে সম্পদ পুঞ্জিভূত হওয়া, রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রচ- কেন্দ্রীকরণের ভয়াবহতার বিরুদ্ধে আমরা আমাদের প্রতিবাদ আন্দোলন অব্যাহত রেখেছি। শত প্রতিকূলতার মধ্যেও সংবাদ মাধ্যম শাসকদের অগণতান্ত্রিক চেহারা লুটপাট, দুর্নীতির যতটুকু সুযোগ উন্মোচন করতে পারতো বর্তমান ডিজিটাল আইন ২০১৮ তারও কণ্ঠ রোধ করবে। ফলে একটি দমনমূলক ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রে পরিণত করার ক্ষেত্রে এ আইন শাসকদের হাতে এক নতুন অস্ত্র হিসেবে বিবেচিত হবে। তাই জনগণের কাছে আপনাদের মাধ্যমে আমাদের আহ্বান আসুন এই চূড়ান্ত নিপীড়নমূলক আইকে রুখে দঁড়াই। কর্মসূচি : ৪ ফেব্রুয়ারি প্রতিবাদ সমাবেশ জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে বিকেল ৪টায়।