বিদ্যুতের বর্ধিত দাম প্রত্যাহারের দাবি ও চালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দামবৃদ্ধির প্রতিবাদে আগামী ৩০ নভেম্বর বৃহস্পতিবার অর্ধদিবস হরতাল সফল করার জন্য আহূত সংবাদ সম্মেলন

Posted: 25 নভেম্বর, 2017

২৫ নভেম্বর ২০১৭ সকাল ১১ টা মুক্তিভবন, পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০ সাংবাদিক বন্ধুগণ জনজীবনের একটি অতিব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে কথা বলতে এবং আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষনা করতে আমরা আজকের এই সংবাদ সম্মেলন আহ্বান করেছি। আমাদের ডাকে সাড়া দিয়ে এই সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত হওয়ার জন্য আপনাদেরকে সিপিবি-বাসদ ও গণতান্ত্রিক বাম মোর্চার পক্ষথেকে জানাই সংগ্রামী শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। বন্ধুগণ, ভোক্তা সংগঠন ক্যাব, বিভিন্ন বামপন্থি, গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল, জ্বালানী বিশেষজ্ঞসহ সকল মহলের মতামত ও সমস্ত তথ্য, যুক্তি উপেক্ষা করে সরকার একগোয়েমি করে বিদ্যুতের দাম আবরো বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। বর্তমান সরকার তার মেয়াদকালে এই নিয়ে আট বার বিদ্যুতের দাম বাড়াল। সরকারের ভুল নীতি, দুর্নীতি, অপচয়, লুটপাট, ব্যাক্তিমালিকানাধীন বিদ্যুৎ ব্যবসায়ীদের মুনাফার জন্য দফায় দফায় বাড়ছে বিদ্যুতের দাম। গত কয়েক বছরে গণশুনানিতে এ বিষয়ে বহুবার যুক্তি উত্থাপন করা হয়েছে কিন্তু গণশুনানির উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে সরকারের ইচ্ছার বাস্তবায়নের লোক দেখানো আইনি পদক্ষেপ। এবারও আমরা ২৪ সেপ্টেম্বর থেকে ৪ অক্টোবর পর্যন্ত অনুষ্ঠিত গণশুনানিতে বিভিন্ন বিদ্যুৎ কোম্পানির দেয়া হিসেব এবং প্রস্তাব বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছিলাম বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির কোনো যৌক্তিকতা নেই। আমরা দীর্ঘদিন ধরে অব্যাহতভাবে বলে আসা সরকারের বক্তব্যের অসারতা প্রমাণ করেছি সরকারের হিসেব থেকেই। সরকার বলে আসছেন, বিদ্যুতে সরকার ভর্তুকি দেয়। এই ভর্তুকির ভার আর বহন করা সম্ভব নয়। আমাদের সাধারণ বুদ্ধি বলে, ভর্তুকি যদি দিয়েই থাকেন তাহলে তা তো বাজেটে সমন্বয় হয়ে যাওয়ার কথা। তাহলে হাজার হাজার কোটি টাকা ঘাটতির প্রশ্ন উঠতে পারে না। আবার অন্যদিকে সরকার হিসেব দেখাচ্ছে যে, ভর্তুকির টাকার সুদ বাবদ প্রতি ইউনিট বিদ্যুতে ২১ পয়সা নাকি ব্যয় হয়। যা বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ বাবদ দেখানো হয়। অথচ একবার বলছেন ভর্তুকি আর একবার সুদের হিসাব দিচ্ছেন এর কারণ কি? সুদ নিলে সেটা তো আর ভর্তুকি থাকে না, তা তখন ঋণ হয়ে যায়। এর কোনো সদুত্তর গণশুনানিতে তাঁরা দিতে পারেন নাই। এর বাইরে বিদ্যুৎ উন্নয়ন তহবিল বাবদ ২৬ পয়সা কেটে রাখা হয়, এর সুফল তো জনগণ পায় না। আমরা বলেছিলাম, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমেছে ফলে তরল জ্বালানি দিয়ে উৎপাদিত বিদ্যুতের দাম কমানো সম্ভব। সরকার কথায় কথায় বলে, আমরা দাম বাড়াই না, মুল্য সমন্বয় করি মাত্র। কিন্তু এক্ষেত্রে বিশ্ব বাজারের তেলের দামের সাথে সমন্বয় করতে দেখা গেল না। অথচ জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা হিসেব করে দেখিয়েছেন জ্বালানি তেলের দাম কমার সাথে সমন্বয় করলে প্রতি ইউনিটে দাম কমানো যাবে ১৪ পয়সা। গণশুনানীতে এবং বিভিন্ন আলোচনা সভা, সেমিনারে পিডিবির চেয়ারম্যানও এই বক্তব্যের সাথে একমত পোষণ করেছেন। এমনকি বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রীও বলেছিলেন তেলের দাম সমন্বয় করলে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রয়োজন হবে না, যা পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। এছাড়া পাইকারি বিদ্যুতের দামের পার্থক্য দূর করলে অর্থাৎ সরকার দাম নির্ধারণ করেছে ৪.৯০ টাকা কিন্তু হিসাব দেখানো হয়েছে ৪.৮৫ টাকা হিসেবে। প্রতি ইউনিটে ৫ পয়সা মানে বছরে ২৭০ কোটি টাকা কোথায় যায়? এই শেষ নয়, ভোক্তা পর্যায়ে বিদ্যুৎ বিক্রিতে উদ্বৃত্ত ৮ পয়সা, পাওয়ার ফ্যাক্টর জরিমানা বাবদ সরকারের আদায় ৪ পয়সা যোগ করলে মোট দাঁড়ায় ৭৮ পয়সা । অর্থাৎ ৭৮ পয়সা প্রতি ইউনিটে সাশ্রয় করা যায়। তাহলে সরকার যে ৩৫ পয়সা দাম বৃদ্ধির ঘোষণা দিয়েছে তার কোনো প্রয়োজন নেই বরং তার চাইতেও প্রতি ইউনিটে ৪৩ পয়সা বা বছরে ২৩১৮ কোটি টাকা বেশি সাশ্রয় করা সম্ভব এক পয়সাও দাম না বাড়িয়ে। প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ, আমরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছি, ব্যবসায়ীদের স্বার্থ নয় জনগণের স্বার্থের কথা ভাবলে বিদ্যুৎসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বাড়ানো নয় কমানো সম্ভব। বিশেষ করে বিদ্যুতের কথা আমরা যুক্তি ও তথ্য উপাত্ত দিয়ে বলেছি বারবার। রেন্টাল এবং কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রে সরকার গ্যাস সরবরাহ করে এবং তাদের কাছ থেকে বেশি দামে বিদ্যুৎ কেনে। রেন্টাল, কুইক রেন্টালে গ্যাস সরবরাহ না করে সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ বাড়ালে প্রায় এক হাজার ৩০১ কোটি টাকা সাশ্রয় করা সম্ভব হবে। জ্বালানি দামের সমন্বয় করলে ফার্নেস ওয়েল ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে দুই হাজার ১১০ কোটি টাকা এবং ডিজেল ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ৫৬০ কোটি টাকা সাশ্রয় করা সম্ভব। ডিজেলভিত্তিক ব্যয়বহুল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বন্ধ রেখে কম খরচের বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু রাখলে উৎপাদনে ব্যয় সাশ্রয় হতো ৭৫২ কোটি টাকা। অর্থাৎ আমরা বলেছি যে, মেঘনা ঘাট আইপিপিসহ বিদ্যুৎ উৎপাদনে সরকারি নীতি পরিবর্তন করলে প্রায় ৭ হাজার ৮৪৩ কোটি টাকা সাশ্রয় করা যায়। জ্বালানির দাম কমার সাথে সমন্বয় করলে ২৬৭২ কোটি টাকা উৎপাদন খরচ কমানো যায় বলে আমরা যে দাবি করেছি গণশুনানিতে বিইআরসি’র সদস্যও তা স্বীকার করে বলেছেন, অতটা নয়, তাদের হিসেবে ১৭০০ কোটি টাকা কমানো যায়। অথচ ৩৫ পয়সা প্রতি ইউনিট দাম বাড়ালে সরকারের বাড়তি আয় হবে ১৮৮৬ কোটি টাকা। এর আগে আমরা বলেছিলাম, অপচয়-দুর্নীতি ও ভুলনীতির পথ পরিহার করলে বিদ্যুতের দাম প্রতি ইউনিট এক টাকা ৫৬ পয়সা কমানো সম্ভব। দাম কমানোর গণশুনানিতে আমাদের এই দাবির যথার্থতা প্রমাণিত হয়েছিল। কিন্তু সরকার আমাদের কথা শুনলেন না। দেশি-বিদেশি বিদ্যুৎ ব্যবসায়ী, এলএনজি ব্যবসায়ী, বিদ্যুৎ আমদানিকারকদের স্বার্থ দেখতে গিয়ে সাধারণ জনগণের উপর মূল্যবৃদ্ধির বোঝা চাপানো হল। বিদ্যুৎ এমন একটি পরিষেবা যা অন্যান্য দ্রব্যের উৎপাদন খরচের উপর প্রভাব বিস্তার করে। কৃষি, ধান থেকে চাল উৎপাদন, গম থেকে আটা তৈরিসহ কৃষি পণ্য উৎপাদন, শিল্প পণ্য উৎপাদন, ইজি বাইকসহ যানবাহন, ওয়াসার পানি উৎপাদন সব কিছুতেই বিদ্যুতের ব্যবহার হয়। ফলে সরকার দাম বাড়িয়ে যত টাকা আয় করবে তার বহুগুণ খরচ বাড়বে সাধারণ মানুষের। এমনিতেই চালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে জনগণ দিশেহারা তার পর বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির খড়গ তাদের জীবনকে অসহনীয় করে তুলবে। সাংবাদিক বন্ধুগণ, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানির দাম বাড়ানো, বাসা বাড়ির হোল্ডিং ট্যাক্স বাড়ানোর সময় সরকার এমন যুক্তি করে যে দাম না বাড়ালে রাষ্ট্র চালানো কঠিন হয়ে পড়বে। দেশের স্বার্থে দাম বাড়ানো দরকার। কিন্তু দেশ থেকে টাকা পাচার, ব্যয়বহুল রাস্তা-ফ্লাই ওভার নির্মাণ, মন্ত্রী আমলাদের জন্য বরাদ্দ বাড়ানোর সময় মনেই হয় না দেশে অভাব আছে। জনগণের প্রতি চূড়ান্ত দায়হীনতা আর লুটেরা ধনিক শ্রেণির প্রতি দায়িত্বপালনের মানসিকতার কারণে এটা ঘটেই চলেছে। এর বিরুদ্ধে যদি রুখে দাঁড়ানো না যায় তাহলে ভবিষ্যতে আরও বড় আঘাত আসবে সাধারণ মানুষের জীবনে। আমরা অতীতেও জনগণের স্বার্থে রাজপথে ছিলাম বর্তমানেও এই অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে জনগণকে সাথে নিয়েই প্রতিরোধ গড়ে তুলতে চাই। তাই আপনাদের মাধ্যমে আমরা জনগণের প্রতি আহ্বান জানাই, আসুন কোটি কোটি মানুষের স্বার্থ রক্ষায় মুষ্টিমেয় বিদ্যুৎ ব্যবসায়ী ও তাদের মুনাফার পাহারাদারদের বিরুদ্ধে রাজপথে নামি। সিপিবি-বাসদ, বাম মোর্চা জনগণের উপর মূল্যবৃদ্ধির এই পাঁয়তারা রুখতে আগামী ৩০ নভেম্বর ’১৭ বৃহস্পতিবার সারাদেশে অর্ধদিবস (সকাল ৬টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত) হরতাল আহ্বান করেছে। জনস্বার্থের এই হরতাল সফল করতে আমরা দেশবাসীর প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছি। আপনাদের সকলকে আবারো ধন্যবাদ।