বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)- বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ ও গণতান্ত্রিক বাম মোর্চা এর মিয়ানমারে রোহিঙ্গা জনগণের ওপর পরিচালিত গণহত্যা-বর্বরতা বন্ধের দাবিতে জাতিসংঘ মহাসচিব বরাবর স্মারকলিপি পেশ উপলক্ষে সংবাদ সম্মেলন

Posted: 20 অক্টোবর, 2017

প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ, শুভেচ্ছা জানবেন। বিশ্বের সবচেয়ে নিপীড়িত জাতিগোষ্ঠীর অন্যতম রোহিঙ্গাদের দুর্দশার চিত্র আমরা প্রতিদিন দেখছি। সহিংসতা, বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়া, হত্যা, ধর্ষণ সহ মানবাধিকার লংঘনের এমন কোন উদাহরণ নেই যা রোহিঙ্গাদের উপর চালানো হয় নাই। জীবন কতটা অসহনীয় হয়ে উঠলে মানুষ সব কিছু ছেড়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে পা বাড়ায় সেই স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়কালিন ভয়াবহ স্মৃতি আমাদের আছে। সাম্প্রতিক সময়ে সিরিয়া, ইরাক, লিবিয়া থেকে প্রাণভয়ে পালিয়ে ইউরোপে আশ্রয় নেয়ার বেদনাময় ঘটনাগুলোর কথাও আমাদের জানা। কিন্তু পাশের দেশে যে মানবতার এত ভয়ংকর বিপর্যয় ঘটলো তা আমরা শুধু প্রত্যক্ষ করছি না তার বিশাল ভার বহন করতে হচ্ছে আমাদেরকে। গত ২৫ আগস্ট মায়ানমার সেনাবাহিনী ‘এথনিক ক্লিনজিং’ এর নতুন আক্রমণ শুরু করার পর আগুন দিয়ে ধ্বংস করা গ্রামের সংখ্যা দাড়িয়েছে অন্ততঃ ২৮৮ টি। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ স্যাটেলাইট থেকে তোলা ছবি দিয়ে বলেছে, মিয়ানমারের রাখাইনে আগুনে রোহিঙ্গাদের গ্রামগুলো প্রায় পুরোপুরি ছাই হয়ে গেছে। মাত্র চার সপ্তাহে পাঁচ লাখের বেশি রোহিঙ্গা কেন মিয়ানমার থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে এসেছে তার কারণ বোঝা যায় ওই উপগ্রহ চিত্রগুলো থেকে। বাংলাদেশে ১৯৭৮ সাল থেকেই রোহিঙ্গাদের আশ্রয়গ্রহণ শুরু হয়েছে। এবারের রোহিঙ্গা বিতাড়ন শুরু হওয়ার আগে থেকেই গত ৩০ বছরে ৫লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। এবারের রোহিঙ্গা ঢল আসার পর এ সংখ্যা ১০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। বামপন্থী দলসমূহ প্রথম থেকেই গণহত্যার নিন্দা, লক্ষ লক্ষ মানুষকে বাস্তুচ্যুত করা ও দেশত্যাগে বাধ্য করার প্রতিবাদ করে এসেছে। মিয়ানমারে গনহত্যা বন্ধে বিশ্ববিবেকের প্রতি আহবান এবং সরকারকে মানবিক ও দায়িত্বশীল আচরণ করার জন্য বামপন্থিরা রাজপথে থেকেছে সবসময়। গত ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৭ সিপিবি-বাসদ ও গণতান্ত্রিক বাম মোর্চার একটি প্রতিনিধিদল সরেজমিনে টেকনাফ-উখিয়া অঞ্চলে শরণার্থী ক্যাম্পসমূহ পরিদর্শন করে আসেন। সেখানে গিয়ে শরণার্থীদের অমানবিক দুর্দশার চিত্র তারা দেখেন। লক্ষ লক্ষ নারী শিশু বৃদ্ধের অসহায় ও হৃদয়বিদারক দৃশ্য পাশাপাশি বাংলাদেশের জনগনের স্বতস্ফুর্ত সহযোগিতা দুটোই আমরা দেখেছি। যদিও রোহিঙ্গা সমস্যার উৎস এবং সমাধান দুটোই মিয়ানমারে; কিন্তু এর আঘাত এবং চাপ সহ্য করতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। যদি এই সমস্যার যথার্থ সমাধানের উদ্যোগ নেয়া না হয় তাহলে সমস্যাকে পুঁজি করে দেশি-বিদেশি শক্তি এবং সাম্প্রদায়িক অপশক্তি ভয়ংকর খেলায় মেতে উঠতে পারে বলে তখন আশংকা প্রকাশ করা হয়েছিল। তাই ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭ সাংবাদিক সম্মেলনের মাধ্যমে আমরা দাবি করেছিলাম - ১. মিয়ানমার থেকে আসা সব শরণার্থীর নাম ঠিকানা লিপিবদ্ধ করে নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করতে হবে। ২. রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে মিয়ানমারের উপর আন্তর্জাতিক চাপ বৃদ্ধি করা। ৩. গণহত্যা-বর্বরতা বন্ধ, রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে সে দেশে ফেরত নেয়া ও তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক তদারকি বাড়ানো। ৪. রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে জাতিসংঘের উদ্যোগ বাড়াতে, কফি আনান কমিশনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে ও ভারত-চীনসহ অন্যান্য দেশকে পাশে পেতে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানো। ৫. মিয়ানমার সরকার ও সামরিক শক্তিকে অভিযুক্ত করে, গণহত্যা-বর্বরতার জন্য আন্তর্জাতিক আদালতে অভিযোগ উত্থাপন করা। ৬. দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষাসহ দেশের জল স্থল সমুদ্র সম্পদ রক্ষায় নজরদারি বাড়ানো। ৭. রোহিঙ্গা শরণার্থীরা যেন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে না পারে এবং কোন অপশক্তি যেন তাদের ব্যবহার করতে না পারে সে জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা। আমরা দেশের জনগনের প্রতি আহবান জানিয়েছিলাম, সাধ্যমত রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়ান। আর সরকারের প্রতি আহবান জানিয়েছিলাম, সহানুভূতি প্রকাশ এবং শুধুমাত্র ত্রাণ বিতরণ করে এ সমস্যার সমাধান হবে না। রোহিঙ্গা সমস্যা বাংলাদেশের উপর অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক চাপ সৃস্টি করছে, সাম্প্রদায়িক মনোভাবকে উস্কে দেয়ার পরিস্থিতি তৈরী করছে। বিদেশ থেকে আগত সাহায্য ব্যবসায়ীদের প্রলুব্ধ করবে, দেশি বিদেশি ত্রাণ এবং সহায়তা লুটপাটের ক্ষেত্র তৈরী করবে। কাজেই আমরা এ বিষয়গুলো বিবেচনা করার আহবান জানিয়েছিলাম। চীন, রাশিয়া, ভারত মিয়ানমারে তাদের ব্যাপক বিনিয়োগের স্বার্থে রোহিঙ্গা ইস্যুতে সহমর্মিতা প্রকাশ করলেও মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে আগ্রহী নয়। অপরদিকে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে সৃষ্ট অস্থিরতাকে আরো উসকে দিয়ে সমস্যাকে গভীরতর করতে চাচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। দক্ষিণ এশিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া নিয়ে মার্কিন ষড়যন্ত্র কারো অজানা নয়। নিরাপত্তা পরিষদে চীন-রাশিয়ার ভেটো ক্ষমতার কারণে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং রোহিঙ্গাদের উপর পরিচালিত গণহত্যা, বর্বরতা বন্ধে মিয়ানমারকে বাধ্য করা সম্ভব নাও হতে পারে। সে কারণে বিষয়টিকে সাধারণ পরিষদে উত্থাপন করে আলোচনার পর সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রের সমর্থন অর্জনের জন্য সরকারকে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। গত পরশু দিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেছেন রোহিঙ্গা ইস্যুতে চীন, রাশিয়া বাংলাদেশের পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করেছে। এই বক্তব্য বাস্তবতা বিবর্জিত ও সত্যের অপলাপ মাত্র। আমরা সিপিবি-বাসদ-বাম মোর্চার পক্ষ থেকে সরকারের প্রতি দাবি জানাচ্ছি, রোহিঙ্গা বিষয়টি এখন আর বাংলাদেশ-মিয়ানমারের দ্বি-পাক্ষিক বিষয় নয়। এটি একটি বহুপাক্ষিক আন্তর্জাতিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। সে কারণে সরকারকে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মিশন পাঠিয়ে সে দেশের সরকারসমূহকে রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা ও বর্বরতা বন্ধে মিয়ানমারকে বাধ্য করতে উদ্যোগ গ্রহণে উৎসাহিত করতে হবে। অপরদিকে চীন, ভারত ও রাশিয়ার বিনিয়োগ ও স্বার্থ বাংলাদেশেও কম নয়। ফলে সরকারকে উদ্যোগী ভূমিকা নিয়ে তাদের সাথে আলোচনার মাধ্যমে রোহিঙ্গা ইস্যুতে তাদের ইতিবাচক অবস্থান নিতে সম্মত করতে হবে। আমরা দেশের জনগণকে আহবান করেছিলাম জাতিসংঘের মহাসচিবের কাছে স্মারকলিপি প্রদান করার। এ লক্ষ্যে সারা দেশে সিপিবি- বাসদ ও গণতান্ত্রিক বাম মোর্চার উদ্যোগে গণস্বাক্ষর সংগ্রহ অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। নিম্নোক্ত দাবীসমূহ নিয়ে গণস্বাক্ষর অভিযানে লক্ষ লক্ষ মানুষ স্বতস্ফূর্তভাবে সাড়া দিয়েছেন। নিম্নোক্ত দাবিগুলো নিয়ে আমাদের স্বাক্ষর সংগ্রহ করা হয়েছে - ১. মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে শরণার্থীর মর্যাদা দিন এবং তাদের থাকা খাওয়া, চিকিৎসা, শিক্ষাসহ সভ্য জীবনযাপনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করুন। ২. মিয়ানমারে বর্বরতা-গণহত্যা বন্ধ করতে মিয়ানমারকে বাধ্য করুন। ৩. রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মিয়ানমারে ফিরিয়ে নিতে এবং তাদের মিয়ানমারের নাগরিকত্বের স্বীকৃতি দিতে বাধ্য করুন। ৪. মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের অবাধ চলাফেরাসহ বসবাসের উপযুক্ত পরিবেশ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন। ৫. জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে কফি আনান কমিশন এর রিপোর্ট বাস্তবায়ন করুন। ইতোমধ্যে কিছু এলাকা থেকে সংগৃহীত লক্ষাধিক গণস্বাক্ষর নিয়ে জাতিসংঘ বাংলাদেশ অফিসে আগামী ২২ অক্টোবর ’১৭ রবিবার সকাল ১১টায় স্মারকলিপি প্রদান করার মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগণের মনোভাব, সমর্থন এবং প্রত্যাশার কথা আমরা জাতিসংঘকে জানাবো। সাংবাদিক বন্ধুগণ, এই স্মারকলিপি প্রদানের পূর্বে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে আমরা দেশবাসিকে জানাতে চাই আসুন, নিপীড়িত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর পাশে দাঁড়াই। সমস্ত ধরনের সাম্প্রদায়িক উন্মাদনাকে রুখে দাঁড়াই। দেশের অভ্যন্তরে আদিবাসী, সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর উপর নির্যাতন অপমান অবমাননার প্রতিবাদ করি। এতক্ষণ ধরে কথা শোনার জন্য আপনাদের ধন্যবাদ।