সিপিবি-বাসদ ও গণতান্ত্রিক বাম মোর্চার নেতৃবৃন্দের টেকনাফ-উখিয়ার রোহিঙ্গা শরণার্থী ও শরণার্থী ক্যাম্প পরিদর্শনোত্তর সংবাদ সম্মেলন

Posted: 14 সেপ্টেম্বর, 2017

প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ শুভেচ্ছা জানবেন। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা মিয়ানমার এর রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর ওই দেশের শাসক ও সামরিক জান্তাদের নিপীড়ন এখন ভয়াবহ বর্বরতা ও গণহত্যায় রূপ নিয়েছে। এর ফলে ঐ অঞ্চলের রোহিঙ্গাদের ঢল বাংলাদেশে ব্যাপক মাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী প্রায় ৪ লাখ রোহিঙ্গা মাত্র ক’দিনে প্রবেশ করেছে। দেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮/১০ লাখ। ঘটনার পরপরই বামপন্থীরা রাজপথে নেমে গণহত্যার নিন্দা জানিয়ে, গণহত্যা বন্ধে বিশ্ববিবেককে জাগ্রত হওয়ার এবং সরকারকে মানবিক ও দায়িত্বশীল আচরণের আহ্বান জানিয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৭ সিপিবি-বাসদ ও গণতান্ত্রিক বাম মোর্চার একটি প্রতিনিধি দল সরেজমিনে টেকনাফ-উখিয়া অঞ্চলের শরণার্থী ও শরণার্থী ক্যাম্পসমূহে পরিদর্শনে যাই। পরিদর্শন টিমে ছিলেন বাসদ (মাকর্সবাদী) কেন্দ্রীয় নেতা শুভ্রাংশু চক্রবর্তী, সিপিবি’র কেন্দ্রীয় সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স, গণসংহতি আন্দোলনের সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকী, বাসদ এর কেন্দ্রীয় নেতা জাহিদুল হক মিলু, কমিউনিস্ট লীগের আব্দুস সাত্তার, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক আকবর খান ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দ। ঐ সময়ে আমরা টেকনাফ, উখিয়ায় অবস্থানরত রোহিঙ্গা শরনার্থী এবং পালংখালী, থাইংখালী, হোয়াইক্যং, কুতুপালং, এলাকার রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করি। ১১ সেপ্টেম্বর সকালে টেকনাফে যেয়ে দেখা যায়, রাস্তার দু’পাশে হাজার হাজার নারী-পুরুষ-শিশু-বৃদ্ধ রোহিঙ্গাদের অবস্থান। ভয়ার্ত অসহায় চেহারার ছাপ স্পষ্ট সকলের মধ্যে। বাস-ট্রাকেও কিছু রোহিঙ্গাদের দেখা যায়। অজানা পথে তাদের যাত্রা। উখিয়া পর্যন্ত প্রায় সর্বত্র রাস্তার পাশে রোহিঙ্গাদের অবস্থান দেখা যায়। নাফ নদী দিয়ে নৌপথে আসা শরণার্থীদেরও দেখতে পাই। পরিদর্শনের সময় আমরা হিন্দু সম্প্রদায়ের ৪৭৩টি রোহিঙ্গা পরিবারকে দেখতে পাই, যারাও ক্যম্পে অবস্থান করছেন। আমরা অনেক রোহিঙ্গাদের মায়ানমারের নাগরিকের পরিচয়পত্রও দেখতে পাই। এদের সাথে কথা বলে জানা যায়, স্থানীয়ভাবে ভীতির সঞ্চার, বাড়ীঘর পুড়িয়ে দেওয়া, কোন কোন পরিবারের সদস্যদের হত্যা, মাইক প্রচার করে গ্রাম খালি করে মিয়ানমার ছাড়ার ঘোষণা শুনেই এরা পাহাড়, নাফ নদী পেরিয়ে বাংলাদেশে এসেছেন। অনেককে কালো পলিথিন ও বাঁশ সংগ্রহ করতে দেখা যায়Ñ যারা রাস্তার পাশে অথবা গড়ে ওঠা শরণার্থী ক্যাম্পের পার্শ্বে বাঁশ গেড়ে সামান্য পলিথিন দিয়ে ঢেকে নিজেদের প্রাথমিক বাসস্থান গড়ে তুলবেন। এসব মানুষের সাথে কথা বলে জানা যায়, “এদের নাম লিপিবদ্ধ করা অথবা এরা কোথায় যাবেন” Ñ এসব কাজ কেউ করছেন না। শরণার্থী শিবির পরিদর্শনে দেখা যায় নতুন করে আশ্রয় দেওয়া রোহিঙ্গাদের করুন অবস্থা। বৃষ্টির পানিতে সয়লাব বাসস্থান, শোচাগার নাই, পানি-খাদ্যের ত্রাণের আশায় তাকিয়ে থাকা অসহায় আর্তনাদ। নাম তালিকাভুক্তির কথা জিজ্ঞেস করলে জানা যায়, এ বিষয় সম্পর্কে তারা জানেন না। অনেকে শুনেছেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এসে তালিকাভুক্তির উদ্বোধন করবেন। সুনির্দিষ্টভাবে সরকারি সহায়তার তথ্য কেউ দিতে পারেননি। প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ, আপনাদের লেখনীর মাধ্যমে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের যে দুরবস্থা দেশবাসী জেনেছেন, তার থেকেও অমানবিক অবস্থা আমরা প্রত্যক্ষ করে এসেছি। আপনারা জানেন, মিয়ানমারের নৃ-তাত্ত্বিক জাতিগোষ্ঠী রোহিঙ্গা নিধন করে ঐ এলাকায় শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের স্বপ্ন মিয়ানমারের শাসক গোষ্ঠীর। এর সাথে চীন-ভারত, পশ্চিমা কর্পোরেট পুঁজির অন্যান্য দেশের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ জড়িত। এক সময় জাতিসংঘও পর্যাপ্ত ভূমিকা রাখেনি। সম্প্রতি কফি আনান এর রিপোর্টে এই সমস্যা ও সমাধানে কিছু দিক নির্দেশনা এসেছে। এর পরপরই মিয়ানমারের শাসকরা আরও হিং¯্র হয়ে উঠেছে। আমরা বামপন্থিরা এসব ঘটনার প্রথম থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করে সরকারকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন ও জনগণের ঐক্য গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে এসেছি। আমরা মনে করি, সরকারকে দৃঢ় অবস্থান নিয়ে এসব অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, গণহত্যা-বর্বরতা বন্ধসহ এসব মানুষকে মায়ানমারের নাগরিক মর্যাদায় সে দেশে নিতে বাধ্য করতে, ওই দেশে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভূমিকা নেওয়া জরুরী। আমরা মনে করি, জাতিগত দৃষ্টিভঙ্গি থেকে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান না করতে পারলে, এই সমস্যাকে পুঁজি করে সাম্প্রদায়িক শক্তি ও দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রকারী অপশক্তি তাদের অভিসন্ধি কার্যকর করতে চাইবে। ইতোমধ্যে সম্প্রদায়িক অপশক্তি বিভিন্ন ধরণের উস্কানী ও প্রচারণা শুরু করেছে। যা ভয়ংকর বিপদ ডেকে আনতে পারে। এদের উদ্দেশ্য আর মিয়ানমারের গণহত্যাকারীদের উদ্দেশ্য প্রকৃত পক্ষে এক। এসব অপশক্তি কখনই রোহিঙ্গা জাতি গোষ্ঠীর বন্ধু নয়Ñ বরং রোহিঙ্গা জতিসত্ত্বা নিধনে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। এ জন্য এই সমস্যা সমাধানে : ১) মায়ানমার থেকে আসা সব শরণার্থীর নাম-ঠিকানা লিপিবদ্ধ করে নিরাপদ আশ্রয়, খাদ্য-চিকিৎসাসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা। ২) রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বৃদ্ধি করা। ৩) গণহত্যা-বর্বরতা বন্ধ, রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে সে দেশে ফেরত নেওয়া ও তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক তদারকি বাড়ানো। ৪) রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে জাতিসংঘের উদ্যোগ বাড়াতে, কফি আনান কমিশনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে ও ভারত-চীনসহ অন্যান্য দেশকে পাশে পেতে কুটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানো। ৫) মিয়ানমার সরকার ও সামরিক শক্তিকে অভিযুক্ত করে, গণহত্যা-বর্বরতার জন্য আন্তর্জাতিক আদালতে অভিযোগ উত্থাপন করা। ৬) দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষাসহ দেশের জল ও স্থল ভাগের সম্পদ রক্ষায় নজরদারি বাড়ানো। ৭) রোহিঙ্গা শরণার্থীরা যেন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে না পড়তে পারে এবং কোন অপশক্তি যেন তাদের ব্যবহার করে অনৈতিক কাজ না করতে পারে তার জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ। বন্ধুগণ, রাখাইনের রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠীর এই সংকটকালীন সময়ে জনগণের ঐক্য গড়ে তোলে সকলে মানবতা ও দেশের স্বার্থকে বিবেচনা করে দায়িত্বশীল আচরণ করবেনÑ এটিই আমাদের প্রত্যাশা। ধৈর্য ধরে আমাদের কথা শোনার জন্য আপনাদের ধন্যবাদ জানাচ্ছি।