বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) ও বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ-এর কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের সুনামগঞ্জ এর হাওর এলাকা সফর উত্তর সংবাদ সম্মেলনের লিখিত বক্তব্য

Posted: 07 মে, 2017

প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ, আন্তরিক শুভেচ্ছা জানবেন। প্রধানত আপনাদের লেখনী ও তথ্য চিত্রের মাধ্যমে দেশের সচেতন মানুষ হাওর এলাকার খবর কিছুটা জানেন। প্রকৃত পরিস্থিতি স্বল্প পরিসরে বর্ণনা করা কঠিন। হাওর অঞ্চলে দুর্যোগ শুরু হওয়ার পরপরই সিপিবি-বাসদ-এর স্থানীয় নেতাকর্মীরা সাধ্যমত দুর্দশাগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। কেন্দ্র থেকে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণসহ স্থানীয় চিত্র তুলে ধরে ঐসব এলাকার ক্ষতিগ্রস্থ মানুষের পক্ষে দাবি তুলে ধরা হয়েছে। ঐ অঞ্চলের সর্বশেষ পরিস্থিতি জানার জন্য গত ২ ও ৩ মে ২০১৭ সিপিবি-বাসদ এর কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ ঐ অঞ্চলে সফর করেন। বাসদ এর সাধারণ সম্পাদক কমরেড খালেকুজ্জামান, সিপিবি প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য রুহিন হোসেন প্রিন্স, বাসদ কেন্দ্রীয় সদস্য বজলুর রশীদ ফিরোজ, সিপিবি কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য কাফি রতন, বাসদ নেতা নিখিল দাসসহ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ সফরে অংশ নেন। ঐ সময়ে সুনামগঞ্জ জেলার শনির হাওর, হাইলের হাওর পরিদর্শন, স্থানীয় নেতৃবৃন্দের সাথে কথোপকথন, জামালগঞ্জ উপজেলার সাচনা বাজার এ পথসভা, সুনামগঞ্জ জেলা সদরে ট্রাফিক পয়েন্টে পথসভা এবং স্থানীয় শহীদ জগৎজ্যোতি পাঠাগার মিলনায়তনে ‘হাওর বাঁচাও, সুনামগঞ্জ বাঁচাও আন্দোলনের’ নেতৃবৃন্দ ও সুধীজনের সাথে মতবিনিময় করা হয়। সুনামগঞ্জের তাহিরপুর ও জামালগঞ্জ উপজেলায় বিস্তৃত শনির হাওর এর বাঁধ রক্ষায় স্থানীয় কয়েক হাজার মানুষ টানা ২৩ দিন চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। ঐ স্বেচ্ছাশ্রমের অন্যতম সংগঠক জামালগঞ্জের বেহেলী ইউনিয়ন পরিষদ সংরক্ষিত মহিলা সদস্য মনেছা বেগম, যিনি টানা ২৩ দিন এই কাজে অংশ নিয়েছিলেন, তার সাথে আমরা কথা বলি। তিনি সাচনা বাজার এর সমাবেশে বক্তব্যও রাখেন। এছাড়া ইউপি সদস্য ক্ষেতমজুর সমিতির উপদেষ্টা সমির আলী আমাদের কাছে স্থানীয় পরিস্থিতির বর্ণনা দেন। সাংবাদিক বন্ধুগণ ২৭ মার্চ থেকে ভারী বৃষ্টি আর ২৯ মার্চ ২০১৭ থেকে ২৪ এপ্রিল ২০১৭ পর্যন্ত উজান থেকে আসা পাহাড়ী ঢলে একের পর এক হাওরের বাঁধ তলিয়ে যায়। দেশের ৬ ভাগের এক ভাগ জুড়ে হাওর অঞ্চল। দেশের মোট বোরো ধানের ৫ শতাংশ এবং মাছ, মাংস, ডিম, দুধ উৎপাদনের প্রায় ২০ শতাংশ আসে এই হাওর এলাকা থেকে। এলাকাবাসী প্রধানত এক ফসলী বোরো ধানের উপর নির্ভরশীল। এই ফসলকে ঘিরে শুধু বছরের খোরাকী নয়, বাড়িঘর মেরামত, বাড়ি বানানো, ছেলে-মেয়ের বিয়ে, সন্তানের পড়াশুনার স্বপ্ন থাকে। ক্ষেতমজুর দৈনিক বাড়তি আয়ের সাথে বছরের ২০/২৫ মণ খোরাকী ধানও জোগাড় করে থাকেন। এবারের অসময়ের বন্যায় এসব স্বপ্ন হারিয়ে হাওরের ক্ষতিগ্রস্ত ২৪ লাখ পরিবার এর প্রায় ২ কোটি মানুষ দিশেহারা। নেই খাদ্য, নেই রান্নার লাকড়ি, নেই পশু খাদ্য। তারপর হাওরের মাছ, হাঁসসহ জলজ প্রাণী মরে যাওয়া ‘মরার উপর খাড়ার ঘা। হাওরের এসব ক্ষতি শুধুমাত্র হাওরবাসীর ক্ষতিই নয়, সারাদেশের খাদ্য নিরাপত্তাকেও হুমকীর মধ্যে ফেলবে। প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ সফরের সময় স্থানীয় জনসাধারণই আমাদের বললেন, ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে মেরামত করার কথা, অথচ মার্চ মাসেও অনেক স্থানে বাঁধ নির্মাণ কাজ শুরু হয়নি। গতবারে যাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ছিল তাদেরই কাজ দেওয়া হয়েছে। আপনাদের লেখনীর মাধ্যমে পত্রিকায় এসব বিষয়ে দুর্নীতি অনিয়মের বিস্তারিত খবর দেশবাসী সকলে জানেন। তাই এটাকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে এলাকার মানুষ ভাবেন না, ভাবেন, ‘দুর্নীতিবাজদের লুটপাট আর অনিয়মের কারণে তাদের কপাল পুড়লো।’ সর্বশেষ এপ্রিল এর শেষে টর্ণেডোর আঘাত সাধারণ মানুষের ঘরবাড়ি আর গাছপালা তছনছ করে দিয়েছে হাওর এলাকার। বন্ধুগণ, প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে প্রকৃতিকে জয় করে যুগ যুগ ধরে টিকে আছে হাওরের মানুষ। এ অঞ্চলে বিকল্প কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র তৈরি করা হয়নি। বরং দুর্নীতি, অনিয়ম, জলবায়ু পরিবর্তন, কৃষক-ক্ষেতমজুরদের নিজস্ব হিসাব পাল্টে দিচ্ছে। এর দায় রাষ্ট্রকেই নিতে হবে। দাঁড়াতে হবে এসব মানুষের পাশে। সুনামগঞ্জে মতবিনিময়ে স্থানীয় ভুক্তভোগী ও সচেতন জনেরা জানালেন, ক্ষতিগ্রস্তের তালিকা প্রশাসন একেক সময়ে একেক রকম দিচ্ছেন, ছাত্ররা লেখাপড়া ছেড়ে কাজ করতে এলাকার বাইরে চলে যাচ্ছেন, প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তরা নয় কার্ড পাচ্ছে দলীয় বিবেচনায়, দুদকের দুর্নীতি বিরোধী তদন্তে দায়সারা গোছের, সরকারি-এনজিও-মহাজনী ঋণ পরিশোধের দুশ্চিন্তা সর্বত্র এ বিষয়ে সরকারি ঘোষণাও স্বচ্ছ নয়, সর্বসাধারণ ভাসান পানিতে মাছ মারার অধিকার পাবে কিনা ঠিক নেই। ক্ষতিগ্রস্ত ২৪ লক্ষ পরিবার অথচ বরাদ্দ পাবে ৩ লক্ষ ৩০ হাজার পরিবার, এটি গ্রহণযোগ্য নয়। খোলা বাজারে চালের দাম ১৫ টাকা হলেও মাত্র ৫ কেজি চাল কিনতে অন্তত ১০০ টাকা ট্রলার ভাড়া খরচ হবে, দিন যাবে, তাই সাহায্য দুর্গম অঞ্চলে ঘরে ঘরে পৌঁছান। আর সর্বত্রই ক্ষোভ হলো : এতবড় দুর্যোগ অথচ ‘হাওর এলাকাকে দুর্গত এলাকা’ ঘোষণা করা হলো না। বরং এই দাবি তুললে সচিবসহ অন্যরা উপহাস করছেন। দায়িত্বপ্রাপ্তরা এলাকায় না এসে বিদেশ ভ্রমণ করছেন। এলাকার মানুষ প্রধানমন্ত্রীর সফরে আসা করেছিলেন, তিনি ‘দুর্গত এলাকার’ ঘোষণা দেবেন। কেউ কেউ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর শুধুমাত্র প্রতিশ্রুতির জন্য টাকা খরচ করে এখানে আসার দরকার ছিল না। ঢাকায় বসেই এ ঘোষণা দিতে পারতেন। তারপরও প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন ও তদারকির দাবি এবং এসব কাজে দলীয় সংকীর্ণতার উর্ধ্বে উঠে এলাকার মানুষের সম্পৃক্ততার কথা এসেছে। প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ আমাদের সফরকালে স্থানীয় মানুষের সামান্য কথা তুলে ধরলাম। আমরা দেখেছি স্থানীয় মানুষ এবারে তাদের দাবি আদায়ে সচেতন ও ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন। আমরা তাদের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করেছি। একইসাথে মনে করি, এটি শুধু ঐ অঞ্চলের মানুষের সমস্যা নয়, সারা দেশের সমস্যা। এজন্য আমরা হাওরের এই মহাবিপর্যয় মোকাবিলায় স্বল্পমেয়াদী ও দীর্ঘমেয়াদী উদ্যোগ গ্রহণের দাবি জানাই। ‘হাওর কনভেনশন’ এর মধ্য দিয়ে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট দাবি তুলে ধরা হবে। বর্তমান সংকট মোকাবিলায় হাওরবাসী বাঁচাতে নিম্নলিখিত পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানাচ্ছি। ১. অবিলম্বে হাওর এলাকাকে দুর্গত এলাকা ঘোষণা করতে হবে। ২. আগামী ফসল না ওঠা পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত সকল পরিবারকে চাল, ডাল, আটাসহ ৮টি নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য দুর্নীতিমুক্তভাবে সরবরাহ এবং চাল ও টাকার পরিমাণ বৃদ্ধি করতে হবে। ৩. ইজারা বাতিল করে সর্ব সাধারণের জন্য জলমহাল উন্মুক্ত করতে হবে। ৪. সুদসহ সরকারি-এনজিও-মহাজনী ঋণ মওকুফ ও আগামী মৌসুমের জন্য বিনামুল্যে বীজ, সারসহ কৃষি উপকরণ দিতে হবে। এবং সুদমুক্ত কৃষি ঋণ প্রদান করতে হবে। ৫. সময়মত বাঁধ নির্মাণ না করা, গাফিলতি, মেরামতে দুর্নীতির জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তা, ঠিকাদার ও পিআইসি’র দায়িত্বপ্রাপ্তদের চিহ্নিত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান এবং প্রকৃত দোষীদের খুঁজে বের করতে গণশুনানীর আয়োজন করতে হবে। ৬. হাওর এলাকায় এসএসসি উত্তীর্ণদের বিনামূল্যে কলেজে ভর্তি নিশ্চিত করতে হবে। ৭. পার্শ্ববর্তী ভারত থেকে আসা ঢল সম্পর্কে এবং পানি দূষিত হয়ে মাছ ও হাঁস সহ জলজ প্রাণীর ক্ষয়ক্ষতির সঠিক তথ্য আদান-প্রদানে স্বচ্ছতা আনা এবং নদী দূষণ প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া। ৮. নিয়মিত খাল-নদী, ড্রেজিং প্রয়োজনীয় অনুযায়ী টেকসই বাঁধ, (রাবার বাঁধ) নির্মাণ করা ও জনবান্ধব উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ। সংগ্রামী বন্ধুগণ, আমরা মনে করি, ‘আগাম বন্যা’, ‘অতিবৃষ্টি’ প্রভৃতি কথা বলে প্রকৃত ঘটনা আড়াল করা ও দুর্নীতিবাজদের দায়মুক্তির ব্যাপারে কেউ কেউ উৎসাহী। স্থানীয় বাস্তবতা চিন্তা না করে নানা ধরনের প্রকল্পে আগ্রহী অনেকে ইতোমধ্যে এসব প্রকল্পে শত শত কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে। এসব কথাকে প্রশ্রয় না দিয়ে সংকটের আশু সমাধান এবং আগামীতে যাতে এ ধরনের দুর্যোগে না পড়তে হয় তার জন্য স্থানীয় জনগণের অভিজ্ঞতা ও বিশেষজ্ঞদের জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে হাওরবাসীকে রক্ষা ও উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণের আহ্বান জানাচ্ছি। ক্ষতিগ্রস্তদের পর্যাপ্ত খাদ্য, জলমহাল উন্মুক্ত দুর্নীতিবাজ-দায়িত্বে অবহেলাকারীদের বিচার, নদী-খাল ড্রেজিং ও টেকসই (রাবার বাঁধ) বাঁধ নির্মাণসহ হাওরের জনবান্ধব উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করুন। আপনাদের সকলকে পুনরায় ধন্যবাদ। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ