হাওরবাসি ও হাওর রক্ষায় হাওরে দায়িত্ব পালনে অবহেলাকারি দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-ঠিকাদার-জনপ্রতিনিধিদের দ্রুত বিচার, ক্ষতিগ্রস্থদের পর্যাপ্ত খাদ্য, জলমহাল উন্মুক্ত, নদী-খাল ড্রেজিং ও রাবার বাঁধ নির্মাণের আহ্বান -সংবাদ সম্মেলনে সিপিবি-বাসদ নেতৃবৃন্দ

Posted: 07 মে, 2017

হাওর অঞ্চলের পরিস্থিতি ও হাওরবাসির বাস্তব অবস্থা সরেজমিনে প্রত্যক্ষ করার জন্য সিপিবি-বাসদের কেন্দ্রীয় একটি প্রতিনিধি দল গত ২ ও ৩ মে সুনামগঞ্জের শনির হাওর ও হাইলের হাওর অঞ্চলে সফর করেন। উক্ত সফরের অভিজ্ঞতা ও হাওরবাসীর বাস্তব অবস্থা তুলে ধরার জন্য সিপিবি-বাসদ আজ ৭ মে সকাল ১১টায় মুক্তিভবনের প্রগতি সম্মেলন কক্ষে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে। সংবাদ সম্মেলনে সূচনা বক্তব্য রাখেন সিপিবি-বাসদ জোটের শীর্ষ নেতা হাওর পরিদর্শন টিমের প্রধান বাসদ সাধারণ সম্পাদক কমরেড খালেকুজ্জামান। সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন সিপিবি-বাসদ জোটের শীর্ষ নেতা সিপিবি সভাপতি কমরেড মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সিপিবি’র কেন্দ্রীয় নেতা ও হাওর পরিদর্শন টিমের অন্যতম সদস্য কমরেড সরদার রুহিন হোসেন প্রিন্স। সংবাদ সম্মেলনে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সিপিবি প্রেসিডিয়াম সদস্য ও পরিদর্শন টিম সদস্য সাজ্জাদ জহির চন্দন, বাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য পরিদর্শন টিমের সদস্য কমরেড বজলুর রশীদ ফিরোজ, সিপিবি’র কেন্দ্রীয় কমিটি সদস্য ও পরিদর্শন টিম সদস্য কমরেড আব্দুল্লাহ-আল কাফি রতন, পরিদর্শন টিম সদস্য ও বাসদ নেতা কমরেড নিখিল দাস। আরও উপস্থিত ছিলেন বাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য কমরেড জাহেদুল হক মিলু, কমরেড রাজেকুজ্জামান রতন, সিপিবি নেতা কাজী রুহুল আমিন, ক্ষেতমজুর নেতা অর্ণব সরকার, বাসদ নেতা খালেকুজ্জামান লিপন, আঃ রাজ্জাক প্রমুখ। সংবাদ সম্মেলনে কমরেড মুজাহিদুল ইসলাম সাংবাদিকদের নানা প্রশ্নের উত্তরে বলেন, প্রতি বছরই হাওরে নানা ধরণের বিপর্যয় হয় কিন্তু এবারের বিপর্যয় অন্যান্যবারের তুলনায় ভয়াবহ। কারণ উত্তর পশ্চিম-পশ্চিম অঞ্চলের ৬টি জেলার ৬২টি উপজেলার ৫৪১টি ইউনিয়নের মধ্যে ৫১৮টিই প্লাবিত হয়। এতে তলিয়ে যায় মোট ২ লাখ ১৯ হাজার ৮৪০ হেক্টর জমির বোরো ধান। ২৪ লাখ পরিবারসহ প্রায় ২ কোটি মানুষ প্রত্যক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তিনি ক্ষোভের সাথে বলেন, আগে বেশী উচ্চতার পানির মধ্যে ভেসে থাকার মত ধান চাষ হত। কিন্তু প্রশাসন অধিক ফলনের আশায় নতুন ধরণের ধান আবাদে উৎসাহিত করছে যা উচ্চতায় ছোট। প্রতি বছরই পাহাড়ী ঢল নামে। এখনকার দুর্যোগ যেমন প্রাকৃতিক। কিন্তু তার সাথে মনুষ্যসৃষ্ট অনিয়ম-দুর্নীতি এবং অপরিকল্পিত বাঁধ দেয়া, সময়মত বাঁধ নির্মাণ না করে লুটপাট এই দুর্যোগকে বহুমাত্রায় বাড়িয়ে তুলেছে। তিনি হাওরের প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে রাবার ড্যাম নির্মাণ, ডুবো রাস্তা নির্মাণ না করে ‘আবুরা’ রাস্তা ও ক্যান্টনমেন্ট নির্মাণ হাওর অঞ্চলকে আরো ভয়াবহ দুর্যোগের মধ্যে নিপতিত করবে বলে হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করেন। কমরেড মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম হাওর সমস্যাকে জাতীয় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে প্রকৃতি-পরিবেশের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ-স্বল্প মেয়াদী ও দীর্ঘমেয়াদী নানা পরিকল্পনা গ্রহণ করার আহ্বান জানান। একই সাথে তিনি সতর্ক করে বলেন উন্নয়নের প্রসব বেদনার নামে হাওরের স্বাভাবিক প্রকৃতি-পরিবেশ নষ্ট করা চলবে না। হাওরবাসির প্রতি সরকারের ক্রমাগত অবহেলা-দুর্নীতি-লুটপাটের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ শক্তিশালী আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানান এবং আগামী ২০ মে ঢাকায় হাওরবাসী জনপ্রতিনিধি, বিশেষজ্ঞ ও শ্রেণী-পেশার মানুষদের নিয়ে অনুষ্ঠিতব্য হাওর কনভেনশন সফল করারও আহ্বান জানান। সংবাদ সম্মেলনে কমরেড খালেকুজ্জামান বলেন, প্রতি বছরেই হাওরে ৫-৩০% ক্ষতি হয়। কিন্তু এবার প্রায় ৯০% হাওর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ফলে বিষয়টিকে প্রতিবারের ন্যায় দেখার কোনো সুযোগ নেই। তিনি বলেন, আমরা ২দিন হাওরবাসির মধ্যে ছিলাম। প্রত্যক্ষ করেছি তাদের ক্ষতির ভয়াবহতা। যে কারণে আমরা হাওর অঞ্চলকে ‘দুর্গত এলাকা’ ঘোষণা করার দাবি করছি। কিন্তু সরকারের কর্তাব্যক্তিরা, মন্ত্রী-এমপিরা জাতিকে নানা বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দিচ্ছেন। কেউ কেউ বলছেন,‘ঐ এলাকার অর্ধেক মানুষ না মারা গেলে আমরা দুর্গত এলাকা ঘোষণা করতে পারি না’ এটা হাওরবাসির দুর্দশা নিয়ে তামাশা ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না। কমরেড খালেকুজ্জামান বলেন, ২৪ লক্ষ পরিবার সরসারি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে কিন্তু সরকার ৩ লক্ষ ৩০ হাজার পরিবারকে ত্রাণ সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে যা গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি বলেন, একজন হাওরবাসি ১০০ টাকা ট্রলার ভাড়া দিয়ে সারাদিন লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে ৫ কেজি চাল ৭৫ টাকা দিয়ে সংগ্রহ করছে। এটা বানভাসি মানুষের দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থা নিয়ে নির্মম রসিকতা ছাড়া আর কিছুই নয়। কমরেড খালেকুজ্জামান বলেন, ২টি সংস্থা পূর্বাভাস দিয়েছিল আগাম পাহাড়ী ঢলের কিন্তু সরকার সতর্ক হয়নি, আমলে নেয়নি। তিনি বলেন, ১৫ জুলাই ২০১১ থেকে জুন ২০১৫ পর্যন্ত হাওর উন্নয়নের জন্য ৬০০/৭০০ কোটি টাকার মেগা প্রকল্প নেয়া হয়েছিল। তা বাস্তবায়ন হয়নি, বরাদ্দের অর্থ লুটপাট হয়েছে। এবার আবার ২৮ হাজার ৪৩ লক্ষ কোটি টাকার মেগা প্রকল্প নেয়া হচ্ছে। বাস্তবে এবারও লুটপাট হবে, হাওরবাসীর উন্নয়ন হবে না। কমরেড খালেকুজ্জামান আরও বলেন, শনির হাওর এর বাঁধ রক্ষায় স্থানীয় কয়েক হাজার মানুষ, ইউপি সদস্য মনেছা বেগমরা ২৩দিন স্বেচ্ছাশ্রম দিয়েও বাঁধ রক্ষা করতে পারেনি। ঐ মানুষদের সহযোগিতা করার জন্য তাদের পাশে তো আমাদের সেনাবাহিনীকে পাঠানো যেত তাদের তো নানা সরঞ্জাম ছিল। কমরেড খালেকুজ্জামান অত্যন্ত ক্ষোভের সাথে বলেন, হাওরের মানুষ যখন দুর্দশাগ্রস্ত, ফসল ডুবে যাচ্ছে, মাছ, হাঁস মরে যাচ্ছে, সেই মানুষদের উদ্ধার করা যাদের দায়িত্ব হাওর সংশ্লিষ্ট সেই ১৪ কর্মকর্তা বিদেশ সফর করছেন। অথচ এ বিষয়ে সরকার নিশ্চুপ। তিনি অবিলম্বে দুর্নীতি, লুটপাট ও অবহেলায় যুক্ত পাউবো কর্মকর্তা, ঠিকাদার, পিআইসি’র কর্মকর্তাদের দ্রুত গ্রেফতারপূর্বক দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেন। এক প্রশ্নের জবাবে কমরেড খালেকুজ্জামান বাংলাদেশের বৃহত্তম হাওর টাঙ্গুয়ার হাওর থেকে মাত্র ৩ কিলোমিটার দূরে ভারতের মেঘালয়ে অবস্থিত ইউরেনিয়াম খনির থেকে বর্জ্য এসে হাওরের পানি দুষিত করছে কিনা? তার প্রভাবে মাছ, হাঁস মরছে কিনা তার প্রকৃত তথ্য দেশবাসীকে জানানো এবং এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারকে আরোও সতর্ক ও ভারত সরকারের সাথে দ্বি-পাক্ষিক আলোচনারও আহ্বান জানান। সংবাদ সম্মেলন থেকে আরো বলা হয়, হাওর এর সমস্যার স্থায়ী সমাধানকল্পে আগামী ২০ মে “হাওর কনভেনশন” করে সবার মতামতের ভিত্তিতে সমস্যার কারণ ও প্রতিকারে করণীয় বিষয়ে বিস্তারিত মতামত তুলে ধরা হবে। বর্তমান সংকট মোকাবেলায় হাওরবাসিদের বাঁচাতে নিম্নলিখিত ৮ দফা পদক্ষেপ গ্রহণ করার জন্য জোর দাবি জানানো হয়। ১. অবিলম্বে হাওর এলাকাকে দুর্গত এলাকা ঘোষণা করতে হবে। ২. আগামী ফসল না ওঠা পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত সকল পরিবারকে চাল, ডাল, আটাসহ ৮টি নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য দুর্নীতিমুক্তভাবে সরবরাহ এবং চাল ও টাকার পরিমাণ বৃদ্ধি করতে হবে। ৩. ইজারা বাতিল করে সর্ব সাধারণের জন্য জলমহাল উন্মুক্ত করতে হবে। ৪. সুদসহ সরকারি-এনজিও-মহাজনী ঋণ মওকুফ ও আগামী মৌসুমের জন্য বিনামূল্যে বীজ, সারসহ কৃষি উপকরণ দিতে হবে। এবং সুদমুক্ত কৃষি ঋণ প্রদান করতে হবে। ৫. সময়মত বাঁধ নির্মাণ না করা, গাফিলতি, মেরামতে দুর্নীতির জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তা, ঠিকাদার ও পিআইসি’র দায়িত্বপ্রাপ্তদের চিহ্নিত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান এবং প্রকৃত দোষীদের খুঁজে বের করতে গণশুনানীর আয়োজন করতে হবে। ৬. হাওর এলাকায় এসএসসি উত্তীর্ণদের বিনামূল্যে কলেজে ভর্তি নিশ্চিত করতে হবে। ৭. পার্শ্ববর্তী ভারত থেকে আসা ঢল সম্পর্কে এবং পানি দূষিত হয়ে মাছ ও হাঁস সহ জলজ প্রাণীর ক্ষয়ক্ষতির সঠিক তথ্য আদান-প্রদানে স্বচ্ছতা আনা এবং নদী দূষণ প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া। ৮. নিয়মিত খাল-নদী, ড্রেজিং প্রয়োজনীয় অনুযায়ী টেকসই বাঁধ, (রাবার বাঁধ) নির্মাণ করা ও জনবান্ধব উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ।