নির্বাচন কমিশন গঠন, নির্বাচনকালীন সরকার এবং নির্বাচন ব্যবস্থা আমূল সংস্কারের লক্ষ্যে মহামান্য রাষ্ট্রপতি সমীপে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির কতিপয় প্রস্তাবনা

Posted: 05 জানুয়ারী, 2017

(৫ জানুয়ারি ২০১৭ খ্রিষ্টাব্দ, বৃহস্পতিবার, সন্ধ্যা ৬টা) ভূমিকা বর্তমান নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে শেষ হবে। নতুন নির্বাচন কমিশন নিয়োগের বিষয়টি তাই সামনে চলে এসেছে। তার প্রেক্ষিতে মহামান্য রাষ্ট্রপতি নতুন প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য কমিশনার নিয়োগ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে আলোচনার উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। এ জন্য মহামান্য রাষ্ট্রপতিকে সাধুবাদ জানাই এবং তার উদ্যোগের সর্বাঙ্গীন সাফল্য কামনা করছি। আমরা আশা করব এই আলোচনার মধ্য দিয়ে শুধু এবারের জন্য নয়, স্থায়ীভাবে সবসময়ের জন্য, যোগ্য নিরপেক্ষ উপযুক্ত ও অবিতর্কিত নির্বাচন কমিশন গঠনের একটি ব্যবস্থা চালু করা সম্ভব করে তুলবে। আমরা মনে করি যে, প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে আলোচনার ওপর নির্ভরশীল না করে তুলে, গোটা প্রক্রিয়াটিকে একটি আইনগত কাঠামোর আওতায় নিয়ে আসা উচিৎ। এ জন্য ‘সিলেক্ট কমিটি’ গঠনের পদ্ধতি নির্ধারণসহ সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদের ১ নং ধারার নির্দেশনা অনুযায়ী উপযুক্ত আইন প্রণয়ন করা উচিৎ। একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, একটি অবাধ, নিরপেক্ষ, সুষ্ঠু, বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের জন্য অত্যাবশ্যক শর্ত হলো একটি স্বাধীন, যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন, পেশাদার, দক্ষ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন। কিন্তু একথাটিও সত্য যে, ‘প্রয়োজন’ হলেও সেটুকুই তার জন্য ‘যথেষ্ট’ নয়। তার জন্য সবচেয়ে বেশি যা প্রয়োজন তা হলো- গোটা নির্বাচনী ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণরূপে ঢেলে সাজানো। প্রয়োজন, ‘সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব’ ব্যবস্থা প্রবর্তন করা। প্রয়োজন, নির্বাচনকে অর্থ, পেশিশক্তি, প্রশাসনিক কারসাজি, সাম্প্রদায়িক প্রচারণা ইত্যাদি থেকে মুক্ত করা। এসব ক্ষেত্রে আমূল সংস্কার সাধন করা ব্যাতীত একটি ‘সর্বৎকৃষ্ট’ নির্বাচন কমিশনের পক্ষেও অবাধ-নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। তাছাড়া, আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে ‘অবাধ-নিরপেক্ষ’ নির্বাচনের জন্য নির্বাচনকালীন সরকার যেন কোনো প্রকারে নির্বাচন প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার না করতে পারে সে বিষয়টি নিশ্চিত করার সাংবিধানিক গ্যারান্টি থাকাও অপরিহার্য্য। নির্বাচন যেভাবে ও যেকারণে তার বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে তাতে করে এ বিষয়টি নিশ্চিত করা আজ একান্তভাবে প্রয়োজন। অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন এবং সেজন্য একটি যথোপযুক্ত নির্বাচনী ব্যবস্থা ও তার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলা ‘রাজনৈতিক-গণতন্ত্রে’র একটি আবশ্যিক শর্ত। নির্বাচনে প্রতিন্দ্বন্দ্বিতা করার জন্য প্রত্যেক নাগরিকের সমান সুযোগ নিশ্চিত করাসহ এবং অবাধ-ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে জনগণের প্রকৃত ইচ্ছা ও মতামতের প্রতিফলন নিশ্চিত করা-এগুলো হলো একটি অবাধ, নিরপেক্ষ ও অর্থবহ নির্বাচনের প্রাথমিক ও মৌলিক উপাদান। এসবের নিশ্চয়তা প্রদান করাই হওয়া উচিৎ নির্বাচন কমিশনের মূল দায়িত্ব। কিন্তু আমাদের দেশের জনগণকে এই ন্যূনতম সুযোগটি থেকেও বার বার বঞ্চিত করা হয়েছে। বর্তমানে শাসক শ্রেণীর ‘মুক্তবাজার অর্থনীতি’র দর্শনের ভিত্তিতে পরিচালিত লুটপাটের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অনুষঙ্গ হিসেবে নির্বাচন বহুলাংশে এক কুৎসিত ‘টাকার খেলা’, ‘পেশি শক্তির প্রতিযোগিতা’, ‘প্রশাসনিক কারসাজি’ ও ‘সাম্প্রদায়িক ধূম্রজাল ও বিভাজন সৃষ্টির ওস্তাদি’তে পরিণত হয়েছে। গরিব শ্রমজীবী মানুষসহ বিত্তহীন, স্বল্পবিত্ত সাধারণ মানুষের পক্ষে নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগকে কার্যত অসম্ভব করে তোলা হয়েছে। জনমত নয়, ‘অর্থ-অস্ত্র-ম্যানিপুলেশন-সাম্প্রদায়িকতা’-ই নির্বাচনের ফলাফলের ক্ষেত্রে নির্ধারক হয়ে উঠেছে। নির্বাচনের নামে কোটিপতিদের প্রতিযোগিতার এই খেলায় ‘জনগণের প্রকৃত ইচ্ছা ও মতামত প্রতিফলনে’র কোনো সুযোগ আর থাকছে না। নির্বাচন আজ নানাভাবে বস্তুত এক ধরনের প্রহসনে পরিণত হয়েছে। এই অবস্থা থেকে নির্বাচনকে মুক্ত করা ও মুক্ত রাখাই হওয়া উচিৎ নির্বাচন কমিশনের কর্তব্য। এমতাবস্থায় অবাধ, নিরপেক্ষ, সুষ্ঠু, বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের স্বার্থে (১) একটি স্বাধীন, দক্ষ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠন প্রক্রিয়া (২) নির্বাচনকালীন সরকার এবং (৩) নির্বাচনী ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোÑএই তিনটি বিষয়ের সবগুলো সম্পর্কে আমরা আমাদের নিম্নোক্ত কতিপয় প্রস্তাবনা মহামান্য রাষ্ট্রপতি সমীপে উত্থাপন করা প্রয়োজন মনে করছি। নির্বাচন কমিশন সম্পর্কে সুপারিশসমূহ ক. নির্বাচন কমিশনকে একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও পর্যাপ্ত ক্ষমতাসম্পন্ন কর্মক্ষম সংস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠার জন্য সংবিধানের ১১৮ (১) ধারা মোতাবেক প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়নসহ যাবতীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। খ. প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বচান কমিশনারদের নিয়োগ দেয়া সম্পর্কে প্রণীত আইনে একটি ‘সিলেক্ট কমিটি’ গঠন ও সেই কমিটি কর্তৃক কমিশনে নিয়োগযোগ্য ব্যক্তিদের একটি প্রাথমিক তালিকা সুপারিশ করার বিধান থাকতে হবে। প্রধান বিচারপতি অথবা এটর্নি জেনারেল, স্পিকার, সরকারি কর্মকমিশনের চেয়ারম্যান, মহা হিসাব-নিরীক্ষকসহ সংবিধানিক সংস্থার প্রধানগণ, এবং রাষ্ট্রপতি কর্তৃক মনোনীত ২ জন বিশিষ্ট দল-নিরপেক্ষ বিশিষ্ট নাগরিকগণের সমন্বয়ে এই ‘সিলেক্ট কমিটি’ গঠনের বিধান করা যেতে পারে। গ. নির্বাচন কমিশনকে আর্থিকভাবে পরিপূর্ণ স্বাধীন করতে হবে এবং এ জন্য বাজেটে এমনভাবে সরাসরি বরাদ্দ প্রদান করতে হবে যাতে ঐ অর্থ পর্যাপ্ত হয়, এবং তা ছাড় করার ব্যাপারে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কোনো কর্তৃত্ব না থাকে। ঘ. নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণ ও হস্তক্ষেপমুক্ত স্বাধীন সংস্থা হিসেবে নির্বাচন কমিশনের সচিবালয়ের কাজ নিশ্চিত করতে হবে এবং তাকে স্বতন্ত্র টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক ব্যবস্থাসহ আধুনিক ব্যবস্থাদিতে সজ্জিত করতে হবে। নির্বাচন কমিশনই তার কর্মচারী-কর্মকর্তা নিয়োগ দেবে। নির্বাচন কমিশনকে সব সময়, বিশেষ করে নির্বাচনের সময়, জন প্রশাসন থেকে যথেষ্ট সংখ্যক জনবল ও পর্যাপ্ত সম্পদ সরবরাহ করতে হবে। ঙ. নির্বাচন কমিশনকে রিটার্নিং অফিসার, প্রিজাইডিং অফিসার এবং নির্বাচনের নিরাপত্তা বিধানের জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী নিয়োগের ক্ষেত্রে পূর্ণ স্বাধীনতা দিতে হবে। নির্বাচনকালীন সময় নির্বাচন পরিচালনার সাথে যুক্ত ব্যক্তিরা যেন প্রকৃত ও পরিপূর্ণভাবে নির্বাচন কমিশনের অধীনে ন্যস্ত থাকেন তা নিশ্চিত করতে হবে। এবং এই সময়কালে তারা কোনো অপরাধ ও কর্তব্যে অবহেলা করলে সে জন্য নির্বাচন কমিশন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে এবং সরকার ও প্রশাসন তা মানতে বাধ্য থাকবে। চ. নির্বাচনী বিধি প্রণয়নের অধিকার নির্বাচন কমিশনের থাকবে। ছ. নির্বাচনী বিধি লঙ্ঘনের জন্য নির্বাচন কমিশন নির্বাচন বাতিলসহ আইন লঙ্ঘনকারীদের আটক ও কারাদ- প্রদান করতে পারবে। নির্বাচনকালীন সরকার ক. নির্বাচনকালীন সময়ে সরকারের কর্তৃত্বকে সাংবিধানিকভাবে সংকুচিত করে তার অন্তবর্তীকালীন কাজ তত্বাবধায়নমূলক ও অত্যাবশ্যক রুটিন কিছু কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে। খ. এই উদ্দেশ্যে সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংশোধন করতে হবে। নির্বাচন ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো ১. সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থা প্রবর্তন ক. জাতীয় সংসদকে হতে হবে প্রধানতঃ জাতীয় নীতি-নির্ধারণ ও আইন প্রণয়ন করার এবং রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় প্রশাসনের কাজ-কর্ম তদারক করার সংস্থা। নির্বাচিত সংসদ সদস্যগণ স্থানীয় উন্নয়ন কাজ, প্রশাসনিক কাজ অথবা এ ধরনের স্থানীয় অন্য কোনো কাজের সাথে জড়িত থাকতে পারবেন না, তারা শুধু জাতীয় নীতি-নির্ধারণ, আইন প্রণয়ন, রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় প্রশাসনের কাজ-কর্ম তদারক করা ইত্যাদি নিয়ে ব্যস্ত থাকবেন। স্থানীয় সব উন্নয়নমূলক ও রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক কাজ-কর্ম সেই এলাকার নির্বাচিত স্বশাসিত স্থানীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হবে। এই ব্যবস্থার ফলে রাষ্ট্র ব্যবস্থার ও প্রশাসনের গণতান্ত্রিক বিকেন্দ্রীকরণ, স্থানীয় সরকারের প্রকৃত ক্ষমতায়ন এবং রাষ্ট্রব্যবস্থার ক্ষেত্রে তৃণমূলে জনগণের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ গভীরতর করা সহজতর হবে। এই লক্ষ্যে জাতীয় সংসদে ‘এলাকা ভিত্তিক একক প্রতিনিধিত্বে’র বদলে ‘জাতীয় ভিত্তিক সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব’ ব্যবস্থা প্রবর্তন করতে হবে। এজন্য সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংশোধন করতে হবে। খ. এরূপ ‘সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব’ ব্যবস্থা অনুযায়ী নির্বাচনের আগে জাতীয় সংসদের নিজস্ব এখতিয়ারভুক্ত কাজ-কর্ম সম্পর্কে নীতি-কর্মসূচি-প্রস্তাবনা পরিকল্পনা বর্ণনা করে রাজনৈতিক দলগুলো দেশবাসীর সামনে নিজ নিজ ইশতেহার উপস্থিত করবে। দেশবাসী এসব ইশতেহারের মধ্যে থেকে যে দলের ইশতেহারে তাদের ইচ্ছার প্রতিফলন দেখতে পাবে, সেই দলের মার্কায় ভোট দেবে। যে দল যত শতাংশ ভোট পাবে, সেই দল জাতীয় সংসদে ততো শতাংশ সংখ্যক প্রতিনিধি পাঠাবে। ঐকমত্যের প্রয়োজনে নতুন ‘সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব’ ব্যবস্থা প্রবর্তনের পাশাপাশি বর্তমান ‘এলাকাভিত্তিক প্রতিনিধিত্ব’ ব্যবস্থাও আংশিকভাবে (অর্ধেক আসনে) অব্যাহত রাখা যেতে পারে। (সকলের মতামতের ভিত্তিতে এই অনুপাত কম-বেশি করা যেতে পারে)। গ. ইশতেহার ঘোষণার পাশাপাশি প্রতিটি রাজনৈতিক দল সংসদে আসন নেয়ার জন্য নির্বাচনের আগেই তাদের দলের অগ্রাধিকারক্রম অনুসারে প্রতিনিধিদের তালিকা দেশবাসীকে জানিয়ে দেবে। নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোট অনুসারে যে কয়টি আসন সেই দলের প্রাপ্য হবে, তালিকার ক্রমানুসারে সেই কয়জন ব্যক্তি সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত বলে গণ্য হবেন। এক্ষেত্রে পুরুষ ও নারীদের পৃথক দু’টি তালিকা করতে হবে। সংসদে নারী ও পুরুষ সদস্যদের সংখ্যার একটি নির্দিষ্ট অনুপাতের বিধান করা হবে এবং নির্ধারিত সেই অনুপাত মোতাবেক দু’টি তালিকা থেকে নাম নিয়ে তাদেরকে নির্বাচিত বলে গণ্য করা হবে। ঘ. এই ব্যবস্থায় সংসদ সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্তির কাজে দলীয় প্রধানের বা নেতৃত্বের কোটারীর স্বেচ্ছাচারিতার আশঙ্কা রোধ করার জন্য দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্রের চর্চা বিধিবদ্ধভাবে বাধ্যতামূলক করা হবে। স্বাধীন নির্বাচন কমিশনকে তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব দেয়া হবে। ২. নির্বাচনে টাকার খেলা বন্ধ করার জন্য ক. একজন প্রার্থীর নির্বাচনী ব্যয়ের সর্বোচ্চ সীমা কমিয়ে ৩ লাখ টাকা নির্ধারণ করতে হবে। খ. প্রার্থী নিজে বা প্রার্থীর পক্ষে অন্য কেউ, যারা যেভাবেই নির্বাচন কাজে অর্থ ব্যয় করুক, তা প্রার্থীর নির্বাচনী ব্যয় হিসেবে গণ্য করতে হবে এবং তা কোনোক্রমে নির্বাচনী ব্যয়ের সীমা লঙ্ঘন করতে দেয়া হবে না। প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় নির্ধারিত একজন কর্মকর্তাকে এই ব্যয় মনিটর করতে হবে এবং তাকে নির্বাচন কমিশনের কাছে সে সম্পর্কে নিয়মিতভাবে প্রাত্যহিক রিপোর্ট দিতে হবে। এই রিপোর্টের সাথে প্রার্থীর দেয়া নির্বাচনী ব্যয়ের বিবরণ মিলিয়ে দেখতে হবে। গ. প্রার্থীর নির্বাচনী আয়-ব্যয়ের বিবরণ সর্বসাধারণের জ্ঞাতার্থে উন্মুক্ত দলিল হিসেবে রাখতে হবে এবং প্রচার মাধ্যমকে তা সরবরাহ করতে হবে। এ বিষয়ে যে কোনো ভোটারের আপত্তি জানানোর সুযোগ রাখতে হবে। ঘ. নির্বাচনী কাজে আয়-ব্যয়ের হিসাব ৭ দিনের মধ্যে জমা দিতে হবে এবং তা করতে না পারলে অথবা নীরিক্ষা করে তা ভ্রান্ত বলে প্রতীয়মান হলে নির্বাচিত সদস্যের শপথ গ্রহণ বন্ধ রাখতে হবে। ঐ বিবরণীর যথার্থতা যাচাইয়ের দ্রুত ও উপযুক্ত ব্যবস্থা করতে হবে। ঙ. (নির্বাচন কমিশনের কাছে) আয়-ব্যয় ও সম্পদের মিথ্যা তথ্য প্রদানকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। চ. ভবিষ্যতে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে অর্থ প্রদান করে নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে প্রার্থীদের নির্বাচনী ব্যয় বহনের ব্যবস্থা চালু করতে হবে। ৩. প্রার্থীদের সম্পদ ও পরিচয় প্রকাশার্থে ক. প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের আগেই তার নিজের এবং পরিবারের সদস্যদের সম্পদের বিবরণ, কোনো রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে তার স্বার্থ জড়িত আছে কিনা ইত্যাদি সম্পর্কে বিবরণ দাখিল করতে হবে। খ. প্রার্থীদের কোনো ক্রিমিনাল রেকর্ড আছে কিনা তা নির্বাচন কমিশনকে জানাতে হবে। গ. নির্বাচন কমিশনকে এইসব তথ্যের সত্যতা যথাসম্ভব যাচাই করে তা জনগণকে অবহিত করার ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে ভোটাররা প্রার্থীর যোগ্যতা-অযোগ্যতা সম্পর্কে অবগত থাকেন। ৪. প্রার্থী মনোনীত হবার যোগ্যতা নির্ধারণে ক. স্বাধীনতাযুদ্ধের বিরোধীতাকারী বা যুদ্ধাপরাধী হলে, নিজে অথবা পরিবারের কেউ ঋণখেলাপী কিংবা ঋণখেলাপির জামিনদার হলে, কালো টাকার মালিক বলে বিবেচিত হলে, সরকারি চাকুরি থেকে অবসর গ্রহণ অথবা চাকুরিচ্যুতির ৫ বছর অতিক্রম না করলে কোন ব্যাক্তি নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবে না। স্বতন্ত্র প্রার্থীর ক্ষেত্রেও এই বিধি প্রযোজ্য হবে। খ. রাজনৈতিক দলের মনোনয়ন প্রার্থী হতে হলে তাকে কমপক্ষে ৩ বছর দলের সদস্যপদ নিয়ে এবং জনগণকে অবহিত রেখে দলের কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে হবে। গ. দলের মনোনয়নপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে তৃণমূল থেকে স্বচ্ছ মনোনয়ন প্রক্রিয়ার ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং দলের অভ্যন্তরে গণতান্ত্রিক পদ্ধতি অনুসরণ এবং মনোনয়নপ্রাপ্তির জন্য অর্থ দ্বারা প্রভাবিত করার ঘটনা কার্যকরভাবে রোধ করার ব্যবস্থা করতে হবে। ৫. ভোটার তালিকা প্রণয়নের ক্ষেত্রে পূর্ণ-স্বচ্ছতা বজায় রাখতে ও সকলের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে ক. ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির জন্য প্রচার মাধ্যমে লাগাতার প্রচার করতে হবে এবং ক্রস চেকিং ব্যবস্থাসহ ভোটার তালিকা প্রতিনিয়ত নবায়ন করার স্থায়ী ব্যবস্থা করতে হবে। কম্পিউটারাইজড ভোটার তালিকা ও ভোটারদের জন্য আইডি কার্ডের ব্যবস্থা ও ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। খ. পার্বত্য শান্তি চুক্তি অনুযায়ী যথাযথ নতুন ভোটার তালিকা প্রণয়ন করে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। গ. প্রবাসীদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তকরণ ও তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের ব্যবস্থা করতে হবে। ঘ. প্রবাসী, কারারুদ্ধ ও নিজ ভোটকেন্দ্র থেকে দূরে কর্তব্যরত ভোটারদের জন্য পোস্টাল ব্যালট প্রদানের সুযোগ নিশ্চিত করতে উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে হবে। ৬. নির্বাচনকে সন্ত্রাস, পেশিশক্তির প্রভাব ও দুর্বৃত্তমুক্ত করতে ক. নির্বাচনে সকল প্রকার বল প্রয়োগ, অস্ত্র বহন ও প্রদর্শন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে এবং এ ধরনের ঘটনায় কঠোর শাস্তির বিধান করতে হবে। খ. কোনো প্রার্থী অথবা রাজনৈতিক দলের পক্ষে পেশিশক্তির মহড়া, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ভয়-ভীতি প্রদর্শন, নির্বাচনী কাজে সন্ত্রাসী-অপরাধী ব্যক্তিকে ব্যবহার ইত্যাদি কঠোরভাবে রোধ করতে হবে। ৭. নির্বাচনে ধর্ম, সাম্প্রদায়িকতা ও আঞ্চলিকতার অপব্যবহার রোধ করতে ক. নির্বাচনে ধর্মের সর্বপ্রকার অপব্যবহার ও সাম্প্রদায়িক প্রচার-প্রচারণার ভিত্তিতে ভোট চাওয়া নিষিদ্ধ এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করতে হবে। খ. ধর্মীয় উপাসনালয়, মন্দির, মসজিদ, গীর্জা, মঠ, ওয়াজ মাহফিল, ধর্মসভা ইত্যাদি স্থান বা অনুষ্ঠানে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কোনো প্রকার নির্বাচনী প্রচার না চালানো, পোস্টার-হ্যান্ডবিল ইত্যাদি বিলি নিষিদ্ধ করতে হবে। গ. ‘আঞ্চলিকতা’র ধুয়া তুলে প্রচারণা ও ভোট চাওয়া নিষিদ্ধ করতে হবে। ৮. নির্বাচনে সকলের সম-সুযোগ নিশ্চিত করতে ক. পোস্টার, লিফলেট, বৈদ্যুতিক বিজ্ঞাপন, মাইক, নির্বাচনী ব্যানার, দেয়াল লিখন, গেইট নির্মাণ ইত্যাদি বিষয়ে যেসব নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা আছে তা ব্যতিক্রমহীনভাবে পালন নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশনকেই ‘সুয়োমটো’ ব্যবস্থা নিতে হবে। তফসিল ঘোষণার আগে এ ধরনের প্রচারণা চালানোর বিষয়েও বিধিবিধান প্রণয়ন ও নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে হবে। খ. নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার দিন থেকে বিশেষ দায়িত্বপ্রাপ্ত স্থানীয় নির্বাচনী কর্মকর্তার মাধ্যমে সকল প্রার্থী ও দলের সমাবেশ, মহাসমাবেশ, র‌্যালি, জনসভা ও অন্যান্য সকল নির্বাচনী কার্যক্রম পরিচালনা করার ক্ষেত্রে আচরণবিধি ও অন্যান্য বিধি-বিধান মেনে চলা হচ্ছে কিনা তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মনিটরিং ও কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। গ. নির্বাচন কমিশন কর্তৃক প্রজেকশন মিটিং-এর ব্যবস্থা করতে হবে। ঘ. রেডিও-টিভিতে প্রচারের সময়কে সমানভাবে বণ্টন এবং এজন্য ব্যক্তিগত বিজ্ঞাপন খরচের উপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে হবে। ঙ. এসব প্রতিটি বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের তত্ত্বাবধানের ব্যবস্থা রাখতে হবে এবং লঙ্ঘনকারীদের প্রার্থীতা বাতিল করাসহ কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। চ. যে কোনো প্রার্থীকে যে কোনো সংখ্যক আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ পুনঃপ্রবর্তন করতে হবে। ৯. রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক চর্চা নিশ্চিত করতে ক. নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলসমূহের গণতান্ত্রিক বিধি-বিধানের ভিত্তিতে পরিচালিত হওয়া, দলের কর্মকর্তাদের নিয়মিত নির্বাচন, দলের আর্থিক বিবৃতি নির্বাচন কমিশনকে প্রদান ইত্যাদি বাধ্যতামূলক করতে হবে। এসব বিষয়ে যাচাইয়ের ব্যবস্থা ও কোনোরূপ লংঘনের ঘটনায় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের নিশ্চয়তা বিধান করতে হবে। খ. নির্বাচন কমিশন কর্তৃক নির্বাচনের ব্যাপারে রাজনৈতিক কর্মীদের প্রশিক্ষণ প্রদান করতে হবে। নির্বাচনী এলাকা নির্ধারণে ও নির্বাচন পরিচালনায় স্বচ্ছতা বিধানে ক. যতোদিন ও যেসব ক্ষেত্রে ‘সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থা‘ প্রবর্তন হচ্ছেনা ততোদিন নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণের জন্য প্রকাশ্য শুনানীর ব্যবস্থা আরো স্বচ্ছ, উন্মুক্ত ও কার্যকর করতে হবে। খ. সাধারণভাবে ভোটারের সমসংখ্যার ভিত্তিতে নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ করতে হবে। গ. প্রিসাইডিং অফিসার, সহকারি প্রিসাইডিং অফিসার ও পোলিং অফিসারদের তালিকা এবং ভোট গ্রহণ কেন্দ্রের তালিকা নির্বাচনের কমপক্ষে দুই সপ্তাহ আগেই দল অথবা প্রার্থীদেরকে সরবরাহ করতে হবে, যাতে এ বিষয়ে কোনো আপত্তি উঠলে তা নির্বাচনের আগেই নিষ্পত্তি করা যায়। ১১. নির্বাচনী ফলাফল ঘোষণা ও সে সম্পর্কিত বিরোধ নিরসনে ক. ভোট কেন্দ্রে সকলের উপস্থিতিতে নির্বাচনী ভোট গণনা ও তার ফলাফল ঘোষণা এবং উক্ত ফলাফলের স্বাক্ষরিত কপি দল অথবা প্রার্থীর মনোনীত ব্যক্তিকে প্রদান করতে হবে। খ. নির্বাচনের ফলাফল কেবল নির্বাচন কমিশন প্রকাশ করবে। গ. নির্বাচনী ফলাফল সম্পর্কে কোনো বিরোধের ক্ষেত্রে হাইকোর্টের কার্যরত বা অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে গঠিত নির্বাচনী ট্রাইবুনালে সে বিষয়ের নির্বাচনী মামলা দুই মাসের মধ্যে মীমাংসার ব্যবস্থা এবং এতদসংক্রান্ত কোনো আপীল সুপ্রীম কোর্টের আপীল বিভাগের বেঞ্চ কর্তৃক তিন মাসের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে হবে। ১২. রাজনৈতিক দল ও প্রার্থী কর্তৃক আচরণবিধি অনুসরণ নিশ্চিত করতে ক. নির্বাচন আচরণ বিধিতে যা রয়েছে তা কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোকে তার জন্য অঙ্গীকার ও সহযোগিতা প্রদান করতে হবে। নির্বাচন কমিশনকে সহযোগিতা প্রদানের জন্য কেন্দ্র ও জেলা পর্যায়ে সর্বদলীয় পরামর্শ কমিটি গঠন করতে হবে। খ. অভিযোগ পাওয়ার জন্য অপেক্ষা না করে, নির্বাচন কমিশনকে নিজ দায়িত্বে মনিটরিং ও অন্যান্য ব্যবস্থার মাধ্যমে আচরণ বিধি অনুসরণ নিশ্চিত করতে হবে। ১৩. নারী আসনে সরাসরি নির্বাচন ব্যবস্থা প্রবর্তন ক. সংরক্ষিত নারী আসনের সংখ্যা বৃদ্ধি ও সরাসরি ভোটে নির্বাচন ব্যবস্থা চালু করতে হবে। ১৪. প্রতিনিধি প্রত্যাহার করার ব্যবস্থা প্রবর্তন ক. নির্বাচিত প্রতিনিধি দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে এলাকার জনগণ প্রয়োজনে যাতে ওই প্রতিনিধি প্রত্যাহার করতে পারে তার বিধান প্রবর্তন করতে হবে। ১৫. ‘না’ ভোট ক. প্রার্থী বা দলের মধ্যে কেউই সমর্থনযোগ্য নয় বলে কারো কাছে বিবেচিত হলে সেক্ষেত্রে ‘না’ ভোট প্রদানের বিধান ও ব্যবস্থা রাখতে হবে।