Revolutionary democratic transformation towards socialism

জাতিকে অন্ধকারে রেখে দেশর স্বার্থবিরোধী কোন চুক্তি দেশবাসী মানবে না: বাম গণতান্ত্রিক জোট


## ভারত সফর নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে বাংলাদেশের অর্জন কী তা স্পষ্ট নয়

বাম গণতান্ত্রিক জোট কেন্দ্রীয় পরিচালনা পরিষদের এক সভা আজ ২৫ জুন, ২০২৪ তারিখে ৮/৪-এ সেগুনবাগিচাস্থ বাসদের অস্থায়ী কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয়। বাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও বাম গণতান্ত্রিক জোটের সমন্বয়ক কমরেড বজলুর রশীদ ফিরোজের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় উপস্থিত ছিলেন সিপিবির সাধারণ সম্পাদক কমরেড রুহিন হোসেন প্রিন্স, বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগের সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য কমরেড অধ্যাপক আব্দুস সাত্তার, বাসদ (মার্কসবাদী)-র নেতা কমরেড ডা. জয়দ্বীপ ভট্টচার্য, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির কমরেড শহীদুল ইসলাম সবুজ, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক পার্টির কমরেড আব্দুল আলী, বাসদের সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য কমরেড নিখিল দাস, কমিউিনিস্ট লীগের সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য কমরেড শামীম ইমাম, সমাজতান্ত্রিক পার্টির নেতা কমরেড রুবেল শিকদার প্রমুখ।

সভার এক প্রস্তাবে বলা হয়, গত ২১ ও ২২ জুন প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের সময়ে ভারতের সাথে দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা স্মারক চুক্তির ব্যাপারে মোটাদাগে কিছু বিষয় সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হলেও বিশদভাবে পুরো চুক্তি কিংবা এমওইউ প্রকাশ করা হয়নি। জনগণ জানে না কী ধরনের বোঝাপড়া, সম্মতি ও চুক্তি শেখ হাসিনা নরেন্দ্র মোদির সাথে করেছেন। দেশের সংবিধান অনুসারে অন্য দেশের সাথে এই ধরনের কোনো চুক্তি বা এমওইউ করতে হলে তা দেশবাসীর কাছে প্রকাশ করা জরুরি। কিন্তু আমরা দেখছি জনগণকে আড়ালে রেখেই এই ধরনের চুক্তিগুলো করা হয়। আমরা সরকারকে দৃঢ়ভাবে বলতে চাই যে, জাতিকে অন্ধকারে রেখে পর্দার আড়ালে দেশের স্বার্থবিরোধী কোনো ধরনের চুক্তি জনগণ মানবে না।
 
দ্বিতীয়ত, জানা গেছে ভারতকে বাংলাদেশের ভিতর দিয়ে রেল করিডোর দেয়ার চুক্তি হয়েছে। অথচ নেপালে যাওয়ার জন্য বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভারতের ভিতর দিয়ে ১৮ কিলোমিটার করিডোর ভারত আমাদের দেয়নি। ভারতকে একতরফাভাবে এতবড় করিডোর দেয়া হলো যে সেটা চালু হলে ভারতের এক অংশ থেকে অপর অংশে যোগাযোগের ক্ষেত্রে পূর্বের রেল যাতায়তের তুলনায় দূরত্ব অনেক কমবে। এতে করে রেল ব্যবস্থাপনা, মালামাল পরিবহনসহ বিভিন্ন বিষয়কে কেন্দ্র করে আমাদের দেশের উপর ভারত তার প্রভাব আরও বাড়াবে। এমনকি অন্যান্য পণ্যের সাথে সামরিক সরঞ্জাম পরিবহন করলো কিনা তা বাংলাদেশের জানার অধিকার থাকবে কিনা তাও নিশ্চিত না। ফলে তাদের পণ্যের এবং যাত্রীর নিরাপত্তার কথা বলে ভারত সামরিক বাহিনী নিয়োগ করলে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব হুমকিতে পড়বে।
 
তৃতীয়ত, অনেকে যুক্তি করেন, ইউরোপের অনেক দেশের মধ্যে এ ধরনের ট্রানজিট ও করিডোর ব্যবস্থা আছে। আমরা বলতে চাই, ইউরোপের পারস্পরিক স্বার্থ রক্ষার বিষয়ের সাথে বাংলাদেশে ভারতের একপাক্ষিক চুক্তিসমূহ মোটেও তুলনা করা যায় না। এই অঞ্চলে ভারতের যে ধরনের আধিপত্য ও প্রভাব বিস্তারের প্রবণতা রয়েছে তাতে রেল করিডোর চুক্তি একতরফাভাবে ভারতের স্বার্থ রক্ষা করা ছাড়া বাংলাদেশের জন্য যে লাভজনক কিছু হবে না এটা নিশ্চিত করেই বলা যায়।

চতুর্থত, বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা

আদায়, সীমান্ত হত্যা বন্ধ, এন্টিডাম্পিং এর নামে অশুল্ক বাধা দূর, বাণিজ্য ঘাটতি দূর প্রভৃতি। এসব নিয়ে কোন আলোচনাই পরিলক্ষিত হয়নি। অথচ বাংলাদেশ অংশে ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তা পানিব্যবস্থাপনা প্রকল্পের জন্য ভারত টেকনিক্যাল টিম তৈরি করে বাস্তবে তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তিকে কৌশলে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। তাছাড়া তিস্তা প্রকল্পের জন্য ভারতের টেকনিক্যাল টিম পাঠানো বাংলাদেশের জন্য অপমানজনক। এককথায় দেশের স্বার্থরক্ষা করে এমন কোনো শর্তই শেখ হাসিনার ভারত সফরে বাংলাদেশ সরকার ভারতের কাছ থেকে আদায় করতে পারেনি। সভায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়, ভারত সম্পর্কে প্রশ্ন করলেই তাদেরকে পাকিস্তানের দালাল বলে এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা দেশের জন্য খুবই বিপদজনক। যা শাসকশ্রেণির নির্লজ্জ ব্যর্থতা ও নতজানু নীতিকে আড়াল করার অপপ্রয়াস।

সভার অপর এক প্রস্তাবে বলা হয়, লাগামহীন দুর্নীতির একের পর এক ঘটনা বেরিয়ে আসছে। দুর্নীতি ও অপরাধের তথ্য উদ্ঘাটনের দায়িত্ব পুলিশ বাহিনীর। কিন্তু সংবাদ মাধ্যমের দ্বারা জনগণ জানতে পারছে সাবেক আইজিপি বেনজির আহমদে ও ডিএমপির সাবেক কমিশনার আসাদুজ্জামান মিয়ার বিপুল সম্পদের কাহিনী। একইসাথে এনবিআর এর সদস্য ও সোনালী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য মতিউর রহমানের অঢেল সম্পদের খবর পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। সাংসদ আনোয়ারুল আজিম আনার হত্যাকাণ্ডের পর সোনা চোরাচালানের বিরাট কাহিনীও প্রকাশিত হয়। দেশবাসী মনে করে এরকম লোক মাত্র এক দুজন নয়, শত শত আছেন। সেজন্য ভীত হয়ে বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন এক নজিরবিহীন বিবৃতি দেয়। যা দুর্নীতিবাজ পুলিশ কর্মকর্তাদেরকে সমর্থন ও প্রশ্রয় দেয়ার সামিল। বিবৃতির মধ্য দিয়ে তারা প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়াগুলোকে কার্যত হুমকি প্রদান করে। তারা ইতিপূর্বে প্রকাশিত রিপোর্টগুলোকে ভিত্তিহীন ও অতিরঞ্জিত বলে অভিহিত করে এবং পরবর্তীতে পুলিশ সদস্যদের ব্যাপারে রিপোর্ট করার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করার কথা বলে। বিবৃতি থেকে বোঝা যায়, পুলিশের মধ্যে অনৈতিক উপায়ে সম্পদ অর্জনকারী লোক এক দুইজন নয়, আরও অনেকে আছেন এবং দুর্নীতির এই সংবাদগুলো আটকানোর জন্য তারা এই বিবৃতি দিয়েছেন। বামজোট এই বিবৃতিকে পুলিশ প্রশাসনের অগণতান্ত্রিক আচরণ ও নিরাপত্তা বাহিনী দ্বারা মিডিয়াকর্মীদের হুমকি প্রদান হিসেবে মনে করছে। গণমাধ্যমের সংবাদ পরিবেশন নয় বরং পুলিশ এসোসিয়েশনের এই বিবৃতিই জনমনে সমগ্র পুলিশ বাহিনীর প্রতি সন্দেহের জন্ম দিয়েছে। সভায় পুলিশ এসোসিয়েশনের এই অনভিপ্রেত বিবৃতি প্রত্যাহারের দাবি জানাচ্ছে।

সভার প্রস্তাবে বলা হয়, একের পর এক দুর্নীতির খবর প্রকাশ হওয়ার পরই দুদক মামলা করছে। অর্থাৎ দুদক যেন বাধ্য হয়ে মামলা করছে। অথচ দুর্নীতির এই ঘটনাগুলো খুঁজে বের করা ছিল দুদকেরই কাজ। সভা থেকে অবিলম্বে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে দুর্নীতিবাজ যে সকল কর্মকর্তা-কর্মচারি আছেন তাদের খুঁজে বের করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বামজোট দাবি জানাচ্ছে।

বাম জোটের সভা থেকে অবিলম্বে ভারতকে রেল করিডোর প্রদানের সিদ্ধান্ত বাতিল ও তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে পানিবন্টন চুক্তি সম্পন্ন করার দাবি জানানো হয়।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন

Login to comment..